Tuesday, February 14, 2017

আধ্যানের ডায়েরি -- পাসপোর্টের দিনে


মা ফোনে বাবাকে পর পর কি সব নম্বর বলে যাচ্ছে একটা ছোট কালো ডায়েরি থেকে। স্বভাব কৌতূহলে "কৈ দেখি দেখি " বলে লাফিয়ে উঠে মায়ের কোলে বসে পরতে মা আমার সামনে তুলে ধরলো আমার পাসপোর্ট। আমার চোখে ভেসে উঠলো সেই ভয়ঙ্কর দিনটা।  বাবার তখন প্রায় সময় হয়ে এসেছে দেশে ফেরার। কিন্তু ছেলে জন্মে গেছে এদেশে।  তাই দেশে ফেরানোর জন্য এখন ভিসা লাগবে। আর ভিসার জন্য লাগবে পাসপোর্ট। তাই তড়িঘড়ি পড়িমরি করে ছেলের পাসপোর্টটা আগে করতে হবে।  আর দেশি হ্যাংলামো তো আছে।  ফাঁকতালে এখানে আমাকে ঠুকে দিয়ে নিজে এখন মার্কিন পাসপোর্ট ওয়ালা ছেলের ফুটেজ খাচ্ছে।  কিন্তু সেদিন চৈত্র বৈশাখ ফাল্গুন গুষ্টির পিন্ডি কিছু একটা মাস , কিন্তু বাবার চোখে দেখেছিলাম আমার এই সর্বনাশ। তখনও  আমি সোজা হয়ে উঠে বসতে পারিনা। বেশির ভাগ সময় ঘুমোই আর বাবার জন্মগত ডিফেক্ট হচ্ছে ঘুমন্ত লোকেদের বিরক্ত করা।  কাকুকে দিয়ে হাতখড়ি , মায়ের ওপর হাতসাফ করে এখন আমার পেছনে লেগেছে।  ডিসগাস্টিং, ইরিটেটিং এন্ড ইত্যাদি ইত্যাদি ফেলো।   যখন লোকে ঘুমিয়ে থাকে তখন লোকে ভগবানের কাছে থাকে।  বিশ্বাসই করে না।  কারণ জানে তো যা নাক ডাকে কোনো রম্ভা মেনকা ছাড় , এক্সপোর্টেড ত্রিবেণী ঘাটের ডোম যে কিনা এখন যমের বাথরুম সাফ করে সেও বাবার কাছে ঘেঁষবে না।  তাই বাবার কাছে ভগবান শুধুই টগোবান। বেশি বলতে গেলেই বলবে কর্মই ধর্ম।  আর কর্ম না করে ঘুমোনো পাপ।  ওরে বাপ্ তোকে কে বোঝাবে ঘুম মানে কর্মের চাকায় তেল দেওয়া। বোঝেনা তাই আমার এই পাসপোর্টটাকেও দিলো তিন বছররের জন্য চটকে।
            আমার তখন সবে দুধ ঘুম আসছে।  প্রায় ঢলে পড়েছি দিদার কোলে।  আর তখনি দেখি হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কি না আমার একটা ছবি তুলতে হবে।  পাসপোর্ট সাইজ। ডকুমেন্ট এ আছে। দিদার কোল থেকে তুলে নিয়ে একটা সাদা তোয়ালের ওপর শুইয়ে দিলো।  হেব্বি বিরক্ত হয়ে গেলাম।  হেব্বি।  মানে কি আর বলবো।  এখন বলতে গিয়েই গা রি রি করছে।  দু তিনটে খচাৎ খচাৎ ছবি তুলে ছবি গুলোকে দেখতে লাগলো।  আমার দিকে কোনো নজর নেই।  বোকার মতো মাটিতে শুয়ে ন্যাজ নাড়াচ্ছি।  তখন তো আবার উল্টাতেও পারতাম না।  জাস্ট নিজেকে আনওয়ান্টেড মনে হচ্ছিলো।  কোনো ছবি বাবার পছন্দ হলো না।  একবার ক্যামেরার স্ক্রিন দেখছে একবার আমার দিকে দেখছে আর চুক চুক চুক চুক আওয়াজ করে চলেছে।  সেই সর্দারের সাদা পাতার জেরক্স করে যেমন কপি মেলানর জোক্স আছে ঠিক সেরকম।  এমনিতেই বাবার ফার্স্ট চান্সের প্রতি আমার এবং স্বয়ং বাবার নিজের ওপর কোনো কনফিডেন্স নেই।  তাই আমি একটু নড়ে চড়ে বডিটাকে তৈরী করে নিলাম যাতে এবার যে পোস দিতে হবে ছবি তোলার জন্য তাতে শারীরিক কোনো ক্ষতি না হয়।  এখন তো আর আমি বাবার ছেলে নোই , বাবার ক্যামেরার অবজেক্ট।  তাই নিজের ডিফেন্স নিজে মেন্টেন করা অত্যন্ত জরুরি। হলোও তাই। মেক ডেকে ছবি দেখাতে দেখাতে বললো তোয়ালে কুঁচকে যাচ্ছে।  ঠিক থাকে ছবি উঠছে না।  ওকে বরঞ্চ বসার পজিসনে দেওয়ালের গায়ে ধরো।  আমি ওর মুখের শুধু ছবি তুলি।

         য়াঁ ???? বলে কি রে ? শেষমেশ ঝুলিয়ে দেবে।  কি কাটা ধানে মোই দিয়েছি রে বাবা। কিন্তু তখন বাবার ওপর কথা বলার মতো শিরদাঁড়া সোজা হয়নি।  মাও হান্ডা গঙ্গারাম।  আমাকে তুলে "প্রাইস পেয়েছি" এরকম একটা পোস দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকলো।  উদ্যেশ্য আমার একটা হাসি মুখ বার করা। কি জ্বালাতন বলো তো। কাউকে দেখেছো পোঁদে ফোঁড়া নিয়ে হায়েনার মতো হাসছে।  আমার একে  এই চূড়ান্ত  আনকমফোর্টেবল পসিশন তার উপর টাঙিয়ে দেওয়ার ভয়।  এই নিয়ে কেউ হাসতে পারে।  দিলাম না হাসি।  যা করবি কর তোরা। কিন্তু অসহায় হলেও প্রেস্টিজে সেন্স তো আছে।  শেষে একটা নিতান্ত গম্ভীর পোস দিলাম, যেটা আমি জানি কোনো দিক থেকে ইম্প্রেসিভ নয়।  কিন্তু হ্যা শেষমেশ বাবা রণে ভঙ্গ দিলো। 

             আমাকে তো খাটিয়ে নিলো। কিন্তু কিছুক্ষন পরে মা খ্যাঁক খ্যাঁক করে তেড়ে এলো বাবার দিকে , "তোমার কি সত্যি কোনো কান্ডজ্ঞান নেই। এটা প্রিন্ট ও করতে হবে।  আর তো হাতে সময় নেই। " বাবার হা করা মুখ টা "ও মা তাইতো " ও বলতে পারলো না।  হঠাৎ দেখি তীরবেগে সবাই দৌড়োদৌড়ি করছে।  বুলেটের মতো ছোটাছুটি।  আমাকেও দেখলাম সটাসট কারসিটে এঁটে দিলো।  দিদা নড়লো না।  পাথরের মতো খাট আগলাচ্ছে।  দাদুকেও বিছানা টানছিলো কিন্তু মা টানতে টানতে নিয়ে গেলো , পাসপোর্ট অফিসে। থুড়ি পোস্টঅফিসে।  এখানে পোস্টঅফিসেই পাসপোর্ট হয়। 
            আমার তখন ঘুমে চোখ জ্বলছে আর ঘরে তখন উত্তেজনা ও গরম।  গাড়িটা ছাড়তেই এ সি জোরে হয়ে গেলো। গাড়িতে থাকলে আমায় নিয়ে বিশেষ কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করে না।  এই সুযোগ।  তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।  চোখ খুললাম দেখি নতুন লোক।  একটা সাদা মহিলা। ওয়েক আপ ওয়েক আপ করে ন্যাকামো ওয়ালা শব্দ বার করছে।  কোথায় তখন আমি স্বপ্নে ফুটবল খেলছি আর জনতার দিকে ফ্লাইং কিস ছুড়ছি আর এরা দিলো তুলে। দেখলাম নাটের গুরু বাবাও আছে।  পাত্তাই দিলাম না।  আমি চোখ বন্ধ করে সবুজ ঘাসে আমার বুট ডুবিয়ে দিলাম।  বেশ কিছুবার সেম জিনিস বার বার ঘটলো।  প্রত্যেকবার চোখ খুলতেই বাবার মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম ব্যাটা এর শেষ না দেখে ছাড়বে না।  ঠিক আছে যেমন কুকুর তেমন আমিও মুগুর। মাঝমাঠে দৌড়ে ড্রিবল করতে লাগলাম।  মাঝে মাঝে মাঠটা দুলে দুলে উঠছিলো বটে তবে আমিও মাঠ ছাড়ার লোক নই।  একসময় ঝড় থেমে গেলো।  পৃথিবী শান্ত হলো।  আর আমার কপাল পুড়লো। 

ছমাস পর আজ যখন মায়ের হাতে আমার চোখ বন্ধ করা পাসপোর্ট ছবি দেখলাম তখন প্রচন্ড রাগ, দুঃখ অভিমান ইত্যাদি ইত্যাদি হলো।  পুরো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন।  এই ভ্যালেন্টাইন ডে তে আমি শপথ নিচ্ছি নেক্সট তিন বছর আমি কিছুতেই প্রেম করবো না।  কি বলবে মেয়েরা এই ঘুমন্ত ছবি দেখে।  যে নিজের মোস্ট ইম্পরট্যান্ট আইডেন্টিটি ক্যাপচারের দিনে ঘুমিয়ে থাকে সে কি করে অন্যের রেসপনসিবিলিটি নেবে।  বাবা, তুমি আমার সামনের তিন বছর খারাপ করে দিলে। আমিও দেখে নেবো।     














No comments:

Post a Comment