Tuesday, August 15, 2017

আধ্যানের ডায়েরী - নেরুদা




দিলো রে দিলো।  সব চুলগুলো কেটে দিলো।  ব্যাপারটা আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি।  অনেক দিন ধরেই মন কষাকষি, মারামারি , আজ নয় কাল চলছিল।  কিন্তু তোমরা এরকম করে আমায় টাকলু করে দেবে সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। 

বেশ কয়েকদিন ধরেই আমার  খুব ঠান্ডা লাগছিল ।  মানে যাকে বলে, রানিং নোস।  মানে একেবারে ভরভরে।  নাক আমার বেশ কিছুদিন থেকেই  বন্ধ। কোথা থেকে যে এই ট্রান্সপারেন্ট সেমি সলিড আমার নাকের মধ্যে এসে জমা হয় বলতে পারিনা বাবু।  মাঝে মাঝেই দুধ খাওয়ার সময় আউট অফ ব্রিদ হয়ে যাই।  তখন দুধের বোতল ঠেলে সরিয়ে, প্রাণ ভরে, মুখ হাঁ করে নিঃস্বাস নিতে হয়।  সেই নিস্বাসে যে কি শান্তি সে আর বলতে। একটু গ্রামাটিকালি গন্ডগোল হয়ে গেলো বটে।   ওটা প্রস্বাস।  নিশ্বাস মানে যেটা ছাড়া হয়।  সমস্যা যদিও সেটাতেও।  তখন আবার দম ছাড়তে গেলে প্রচন্ড এক চাপ দিতে হয়।  যদিও ইনভিসিবল নিস্বাসের সাথে ভিসিবল পোঁটা থ্যাক করে বেরিয়ে আসে।   দৃশ্যদূষণ হতে পারে বটে কিন্তু আমার কিছু করার নেই , আগে হেলথ তারপর এটিকেট। 

নাক থেকে এগুলো বেরিয়ে এসে আমায় মুক্তি দেয়না।  মা বা বাবা যদি কাছে না থাকে তাহলে সেগুলো আবার আটকে যায় গালে।  হাত দিয়ে ঘষে দিলে মাঝে মঝে আবার চুলেও আটকে যায়।  সেগুলো শুকিয়ে আবার সাদা হয়ে যায়।  আমার এই সাদা চামড়ায় আরো সাদা হয়ে নুনের ড্যালার মতো দেখতে লেগে।  আমি চেটেও দেখেছি , বেশ নোনতা নোনতা।  যাইহোক।  দ্যাটস নট দা পয়েন্ট।  মুদ্দাটা হলো এই সর্দি হওয়া নিয়ে মা আর বাবার মধ্যে ঝগড়া। 

মায়ের মতে, আমার চুল বড় হয়ে গেছে তাই  স্নানের জল শুকোতে সময় লাগে।  সেই ঠান্ডা জমে নাকি আমার সর্দি হয়।  আমি ভাবলাম ইট মে বি এ কস।  যখন এই সর্দি বেরোয় তার কিছুদিন আগে থেকে বেশ ঠান্ডা লাগতে আরম্ভ করে বটে ।  কিন্তু বাবা তো ইন্টারনেট , সব কিছুর একটা পাল্টা উত্তর রেডি।  বাবার মতে এই শুকনো ওয়েদারে সর্দি গর্মি হয় না। বাবার নাকি এখানে কখনো ঠান্ডা লাগেনি।  ভারী আমার ভীমসেন।  নিজেকে জাহির করার একটা সুযোগও ছাড়ে না।  কিন্তু এই ব্যাপারে আমার মন যেন বাবাকে সায় দিলো। আসলে এই সুন্দর কার্তিকের মতো চুলের বদনাম ঠিক ভালো লাগে না। 

চুল কিন্তু আমার একদম জব্বর।  এক কালে প্রশ্ন উঠেছিল চুলটা ঠিক কার বাড়ির মতো হবে।  মায়ের বাড়ির মতো না বাবার বাড়ির মতো খোঁচা খোঁচা।  কিন্তু আমি তো আমার মতো।  তাই শেষমেশ আমার নিজের মতোই লম্বা লম্বা কোঁকড়ানো সুন্দর চুল হয়েছিল আমার।  এই একটা জিনিসে বাবা মার্ দুজনার ঝগড়া কয়েকদিন রোকা গেছে।  কারো দিকে হেললেই সমস্যা।  সবাই আমাকে তাদের বাবার সম্পত্তি মনে করবে।  কিন্তু টেকনিক্যালি আমি যখন নিজের বাবারিই সম্পত্তি নই তখন কারোকে স্বত্ব দিতে আমার বিশেষ মন বা মানসিকতা নেই। 

যাইহোক কাম ব্যাক টু চুল।  পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সমস্ত মানুষের মতে , এই চুল আমার কিউটনেস বা বিউটি কে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছিলো ।  হবে না কেন।  আমার দেশে তো সবাই টাকলা।  ইভেন মা, যার নাকি পাছা ছাড়ানো চুল ছিল, সেও তো রিঠা, শিকাকাই, দেশি বিদেশী , একটিভ ভিটামিন প্রো ভি সব কিছু চেষ্টা করেও প্রতি সপ্তাহে বাথটব থেকে মুঠো মুঠো চুল বার করতো। সেই আকালের দেশে আমার সুরক্ষিত কালে মেরে  বাল , নানা এটা ভ্যাসমলের কেরামতি না, অন্দরুনি তাকত। এই সেই চুল যেটা আমি পেটের ভেতর থেকে নিয়ে এসেছি ।  টেকনিক্যালি এটা শুধু আমার আর মায়ের ক্রেডিট।  মা বলে এই দুটো চুল নাকি প্রায় চার পাঁচ ঘন্টা আগে থেকে দেখা যাচ্ছিলো যখন আমি বেরোয়নি।  সে থাক।  চুল আমার মসৃণ এবং এট্রাক্টিভ।  যখন আস্তে আস্তে বড় হয়ে গেলো।  তখন এক এক সময় আমাকে এক একজন সেলিব্রেটির মতো দেখতে লাগলো।  যখন স্নান করতাম তখন বাবা বলতো মোগলির মতো লাগছে।  যখন মা চুল শুকোতো তখন মায়ের ব্লোয়ারের সামনে বসে থাকলে বলতো  টম ক্রুসের মতো চুল।  কিন্তু আঁচড়ে দিলে বলতো "একেবারে চুমকু সোনা লাগছে। " কি বিচ্ছিরি নাম।  চুমকু ? চুমকু মানে কি।  তীব্র আপত্তি পাত্তা পায়নি।  কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগতো না উপমাটা। 

তবে আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলতাম আমার চুল মেঘের মতো।  দেখো ছোট চুলে স্টাইল হয় না।  স্টাইল করতে গেলে চুল বড় করতেই হয়।  ছোট চুলের একটাই স্টাইল - বাধ্যতা। উকুন , ড্যানড্রাফ আর গরমের জ্বালায় এই স্টাইলের উৎপত্তি।  আর আমি মনে করি ওটা চোরেদের  স্টাইল।  ধরতে যাতে না পারা যায় তার জন্য এই স্টাইল। আমি চোর নই, তবু মাঝে মাঝেই যখন আমি কিছু ভেঙে ফেলি তখন মা বলে চোর চোর তাকাচ্ছি।  চোর কি করে তাকায় সেটা তুমি কি করে জানলে বাপু।  একবার যদি চোর চোর কোথাও সাউন্ড পাও , তাহলে তো আমার থেকেও সিলি মুখ করে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলো।  জবরদস্তি আমাকে চোর বানিয়ে চোর স্টাইল চুল কেটে দেওয়া, আনবিলিভেবল ঔদ্ধত্য।

আমাদের  বেডরুমে বেশ কয়েকটা ছবি আছে।  তার মধ্যে একজনের সঙ্গে আমার চুলের হেবি ম্যাচ।  আমি অনেকবার তাকে ছুঁতে গেছি। কিন্তু মা বাবা শকুনেরও অধম।  সব সময় ছোঁ মেরে আমাকে তুলে নিয়ে বলে "নো এটাক"।  ওটা আমাদের ইষ্টদেবতা।  হোয়াট ইস ইষ্ট ? ওটা তো কেষ্ট বা কিন্ন।  আমার সেই কিন্নর মতো চুল।  এই তো সেদিন নিউ ইয়র্ক গেছিলাম।  সে গল্প পরে শোনাবো।  সেখানে গিয়ে আমার চুলের আসল মহিমা বুঝতে পারলাম।  যখন খুব হাওয়া দেয় তখন চুল কি সুন্দর ওড়ে।  আর কানের কাছে আর মাথার ওপর কিরকম সুড়সুড়ি লাগে।  বাবা আবার সুড়সুড়ি চ্যাম্পিয়ন।  ঠিক বোঝে কোন জায়গায় আঙ্গুল বোলালে সুড়সুড়ি ভালো লাগে। সবাই যখন সুড়সুড়ি দেয় তখন সারা মাথায় হাত ঘষতে থাকে।  সেটা রাইট এপ্রোচ নয়।  জার্নি শুড স্টার্ট ফ্রম প্লেন ল্যান্ড, এন্ড হোয়েন ল্যান্ড মিটস দা মাউন্টেন ,দেন অনলি হ্যাপিনেস কামস।  আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে কাঁধ থেকে চুল পর্যন্ত তুলে নিয়ে যেতে হবে।  তখনি আসবে ঘুমের আমেজ।  এই ব্যাপারে বাবাকে থ্যাঙ্কস।  হি অলোয়েস ডাস ইট রাইট।    

বাবার তীব্র লজিকাল আপত্তিও যখন পাত্তা পেলো না।  তখন বাবা আরো লজিক ইমপ্লিমেন্ট করে বললো যে আঠারো মাস না হলে চুল কাটতে নেই।  মা সেই একরোখা বাঘিনী।  বাবাও নাছোড়বান্দা।  তোমারও নয় আমারও নয় , বেজোড় মাসে কাটতে হয়।  বাবা ওয়াস ট্রাইং টু বায় সাম টাইম।  এটা বাবার চিরাচরিত টেকনিক।  বাবার মতে একটু সময় কিনে নিতে পারলে, পরে টপ আপ করতে বেশি খাটতে হয় না।  কিন্তু মা সুগার হিম বোন টু বোন।  মা বললো তাহলে কোনটা ক্যালকুলেট করতে হবে - কমপ্লিটেড না অনগোয়িং।  মানে আমি চোদ্দ মাস কমপ্লিট করেছি আর পনেরো মাস চলছে।  বাবা এই যুক্তিতে চুপ।  আর কোনো ট্যাঁ ফোঁ নেই। 

দিনটা এসে গেলো। আমার কোনো আইডিয়া ছিল না।  গত সপ্তাহ থেকে কোথাও একটা যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছিলো।  কোনো একটা জায়গা, যেখানে নাকি আমি আগে গেছি কিন্তু আবার যাওয়া যাবে।  আমার আর কি আমার ঘুরতে যেতেই ভালো লাগে।  বেশ লাগে।  তাই সবাই জামাকাপড় পড়লেই আমার হৃদয় নেচে ওঠে।  আমি তো ম্যান, আমার মধ্যে অতো জটিলতা নেই।  আমি ভাবলাম সবাই যখন বেশ সুন্দর জামা কাপড় পরে নিয়েছে তাহলে আমরা শেষমেশ ঘুরতে যাচ্ছি। বিশাল উত্তেজনা নিয়ে গাড়িতে উঠলাম।  গাড়ি চলতে লাগলো আর নিমেষের মধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। 

বেশিক্ষন হয়নি হঠাৎ কোমরের কাছে টানাটানি হতে বুঝলাম ডেস্টিনেশন রিচড। আমি নরমালি ঘুম থেকে উঠে একটু আড়মুড়ি ভাঙি কিন্তু যেহেতু এন্টারটেইনমেন্ট ইস দা প্রায়োরিটি তাই আমিও সজাগ এবং উত্তেজিত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে দেখি ভোঁ ভাঁ।  একটা ফাঁকা পার্কিংলটে দাঁড়িয়ে আছি।  ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাবা মা কে ফলো করতে লাগলাম।  মা একটা দোকানে গিয়ে ঢুকলো।  আমার ব্যাপারটা ঠিক ভালো ঠেকলো না।  সিক্সথ সেন্স বলে তো একটা জিনিস আছে।  সেটা আবার আমার একটু বেশি স্ট্রং।  কিন্তু পিছু তো ফেরা যাবে না।  তাই বাবার হাত ধরে ঢুকে পড়লাম দোকানটাতে। 

বেশ মজাদার দোকানটা। নানা রঙ দিয়ে সাজানো একটা জঙ্গল টাইপের।  মজাদার সব গান বাজচ্ছে।  কোথাও বাঁদরের ছবি, কোথাও জিরাফের।  উঁচু নিচু সব খেলার জায়গা।  তার মাঝে এক দুজন আবার বসে আছে।  আর চুল কাটছে।  ও হরি।  তারমানে এবার আমারও ঘ্যাচাং ফু।  ডুকরে কেঁদে উঠতে  আমার থেকে এক হাত লম্বা একটা ছেলে এসে কিরকম লম্ফো ঝম্প করতে লাগলো।  আর আমার সাথে টুকি টুকি খেলতে লাগলো।  আমার বেশ মজা লেগে গেলো।  এই টুকি টুকি খেলাটা হেব্বি মজাদার।  এখানে আবার বলে পিক এ বু।  নতুন শিখেছি তাই সবার সাথে খেলতে বেশ মজা লাগে।  কিন্তু মাঝখানে আমায় থামিয়ে বাবা কোলে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলো চেয়ারে। 

বসানোর সাথে সাথে একটা মহিলা এসে হাজির হলো।  আমার সাথে বেশ কিছুক্ষন হাসি হাসি মুখ করে অনেক কিছু খেলার চেষ্টা করলো, হুইচ ইস সিম্পলি বোরিং। তারপর একটা মেশিন বার করতেই আমি ব্যাপারটা বুঝে গেলাম।  তারপর শুরু হলো স্ট্রাগল আর ডিফেন্স।  কিন্তু বিভীষণের জন্যে রাবণকেও হার মানতে হয়েছিল।  মা ধরলো দুটো হাত , বাবা ধরলো থুতনি।  আমি নট নড়ন ,নট চরণ।  আর কি বলি।  আমার সুন্দর চুল , নিমেষে ভূমিতে মিশে গেলো।  কিছুক্ষনের মধ্যেই মাথা হালকা।  এর মধ্যে আবার ঢং করে ছবি তুলে সেটা আবার প্রিন্ট করা হলো।   ফার্স্ট হেয়ারকাট।  তারপর সেটাকে আবার একটা কার্ডের মধ্যে রেখে বাবাকে দিয়ে দিলো। 

বাবা , সেই বাবা ,যে আমার চুলের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছিলো , সেইই বিস্বাসঘাতকতা করলো।  মানছি পুরুষ মানুষদের অনেক কিছু মেনে নিতে হয়।  কিন্তু তারপর ন্যাকামো করতে তো কেউ বলেনি।  চুল কাটার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেলো , "কি সুন্দর লাগছে।  আমার নেরুদা।  আমার ছোট্ট টিবেটান মংক, আমার ওল্ড মংক। " আমি জাস্ট নিতে পারছিলাম না, ওই ন্যাকামোগুলো। নেরু , টাকলা , গাঞ্জা এসব এবার আমায় শুনতে হবে।  আদো আদো গলায় বললেই সবকিছু কিউট আর একসেপ্টেড হয় না। দোস সাউন্ডস এস ইরিটেটিং এস ইট ফিলস।  কিন্তু কিছু করার নেই।  দুর্ঘটনা ঘটার পর যদি সেটা মেনে না নেওয়া যায় তাহলে বুকের রক্ত গলায় উঠে যায়।  সেটা আর নামতে চায় না।  আমার তখন রাগে, ক্ষোভে মাথা ঝাঁ ঝাঁ  করছে।  কিন্তু গাড়ির ওপর আমার রিফ্লেকশন দেখে আমার বেশ মজা লাগলো। 


নাহ , খুব একটা কুৎসিত লাগছে না।  বরং বেশ সুন্দরই লাগছে।  বাবা ঠিকই বলেছে।  ছোট্ট মঙ্কের মতো লাগছে।  কিন্তু বাবা , স্পেশালি মা শোনো ভালো করে , নাম রেখেছো আধ্যান,  চুল কেটে মংক এর মতো বানিয়ে দিলে।  এবার যদি সেই মঙ্কের মতো যে নিজের ফেরারি বেচে চলে গেছিলো তিব্বতে তার মতো গৃহত্যাগ করি তখন কি করবে? দিস টাইম ফার্স্ট মিস্টেক পার্ডনড , কিন্ত কনসিডার ইট এস এ সিরিয়াস থ্রেট। পরের বার যদি হয়েছে এরকম, তাহলে কিন্তু টাটা বাই বাই।  হাজার কাঁদলেও উপায় নাই।  এই বলে রাখলাম।    

আধ্যানের ডায়েরির আগের পাতাগুলো 

Monday, August 14, 2017

শঙ্খচিলের ক্ষুধা

এ আগুন , নিঃস্ব সাজায় শঙ্খচিলের বেড়া,
জানিনে কালকে আমার গতি , হয়তো পড়বে ধরা।
স্বার্থক খাদ্য হয়ে তৃষার আগুন করিব স্নিগ্ধ ,
অর্ধ পচন সারে জ্বলিব অর্ধ দগ্ধ।
আজ হবে কাল , বিষাদ রবে , সাঙ্গ হবে শান্তি।
কালকে আমি শঙ্খচিলের , সফেদ ভুলভ্রান্তি।
আকাশ থেকে পড়বে খসে শঙ্খচিলের ক্ষুধা ,
রক্তমুখে ফিরবে আকাশে অন্তঃ নির্দ্বিধা।
কেউ রবে না আমার পাশে , কেউ রবে না চিৎকারে।
একই আমি পড়ব খসে মৃত্যূকূলের সংসারে। 

Friday, August 11, 2017

আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ




হেঁ হেঁ , হেঁ হেঁ  রবি ঠাকুর।  তাইতো তাইতো।  লিখতে তো হবে রবি ঠাকুর নিয়ে।  তাও আবার আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ।  আমি আবার রবীন্দ্রবিরোধী।  পার্লামেন্ট এ বামপক্ষ না থাকলে খেলা  জমবে কি করে।  সবাই হাতে কাদা , পচা টমেটো , নিজের না হলেও অন্যের বিষ্ঠা নিয়ে পড়তে আরম্ভ করো। 

আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ বাংলার আর দশটা লোকের থেকে খুব একটা বেশি বা কম জড়িয়ে নেই।  কুমোর পাড়ার গরুর গাড়িতে কে না চড়েছে।  জোর করে নাকে মুখে ঠুসে রবীন্দ্রনাথ নামক আলুভাতে সবার পাতেই কম বেশি পড়েছে।  যখন থেকে বোঝার ক্ষমতা হলো তবে থেকে দেখছি বাড়ির শোকেসে বিশাল রবীন্দ্র রচনাবলী।  কেউ পড়েনা।  পড়লেও পুরোটা পড়া কারো পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি , কিন্তু কথায় কথায় , "ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে " ঝাড়তে কেউ ছাড়ে না।  বিশেষত রেজাল্ট বেরোনোর আগে। 

প্রতি বছর বাংলা পরীক্ষা এক জীবনযন্ত্রণার সূত্রপাত ঘটাতো।  বাংলা বলতে ভালো লাগে , শুনতে ভালো লাগে কিন্তু লিখতে , ইশশশ । লোকে বড় হওয়ার অপেক্ষা করে স্বাধীনতা, পয়সা আর প্রেয়সীর জন্য । আমি অপেক্ষা করতাম , কবে বড় হব আর বাংলা পরীক্ষা দিতে হবে না । ওই সমচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দযুগলের অর্থপার্থক্য নির্ণয় আমার রাতে ঘুমের মধ্যে এসে চিমটি কাটত। আর ছিল রচনা বউদির ডিমান্ড । ওয়ার্ড লিমিট আরেক হুল ।  জ্ঞানীরা চাইতো আরো বেশি বেশি শব্দ।  আর আমি চাইতাম যত কম হোক।  আমার দ্বারা ভাব সম্প্রসারণ হতো না, হতো সংকোচন।  তাই সাহিত্য বলতে রহস্য রোমাঞ্চ সেই বয়সে অতিরিক্ত প্রিয় ছিল।  হঠাৎ করে পরীক্ষার আগে এক হাওয়া এলো যে, রচনায় যদি কোটেশন দেওয়া যায় তাতে নাকি নম্বর বেশি পাওয়া যায়।  আমার আবার মুখস্থ করতেও গায়ে জ্বর আসতো।  কোনো ভাবে মুখস্থ করে নিলেও সেটা ভাবের প্যান্ট পরিয়ে ঠিক জায়গায় চেন বসিয়ে টানা আমার কাছে ভবিষ্যতের মতো - অন্ধকার।  কিন্তু এই সময় শরীরে কিছু ঢেউ খেলার কারণে মাঝে মাঝে ছন্দ মিলিয়ে দু চারটে কবিতাও লিখে ফেলেছিলাম।  মাথায় এলো ফন্দি।  পরীক্ষার খাতায় ফটাফট দুটো লাইন ঝেড়ে দিয়ে নিচে লিখে দিতাম রবীন্দ্রনাথ বলেছেন।  এটুকু কনফিডেন্স ছিল যে কেউ রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কবিতা পড়েনি, আর পড়ে থাকলেও মুখস্ত রাখা ইম্পসিবল। রেজাল্ট বেরোনোর পর খাতা দেখার দিন রবীন্দ্রনাথকে যে কি ভাবে থ্যাংকু বলেছি সে আর এখানে লিখছি না। 

এরপর ধীরে ধীরে শরীরে ও মনে হাজার হাজার পরিবর্তন এলো।  যে কোনো মেয়েকে দেখে ভালো লাগতে শুরু করলো।  সব কিছুই ছন্দময়। প্রচুর কবিতা লিখতে আরম্ভ করলাম।  কিন্তু কবিগুরুর কবিতা যেই পড়তে আরম্ভ করলাম আমার বমি পেতে আরম্ভ করলো।  এই গুলো কবিতা বলে ? কি স্লো , কি বেকার। এর থেকে রগরগে নজরুল আর বাংলা ব্যান্ড তো অনেক ভালো।  সেই বয়সটা এমন থাকে , যে লোকের ন্যাকামো সহ্য হয় না।  আর আমারও তখন রবীন্দ্রনাথের ওই ন্যাকা ন্যাকা কবিতা গুলো ভালো লাগতো না।  বীররস বা  স্বাধীনতা সম্বন্ধীয় কবিতাগুলো মন কাড়তো বটে , কিন্তু সে আর কটা। 

বন্ধুরা তখন প্রেমে চুপচুপে।  সবাই শেষের কবিতা শেষ করছে।  আমি পড়ে তো থ।  উপনাস্যেও নেকিয়েছে ?  অমিত আর লাবন্যর মতো বেকার নাম আমি কিছুতেই ক্যারেক্টার হিসেবে মেনে নিতে পারিনি।  তার ওপর যে ডায়লগের গভীরতা।  এতো গভীরে ঢুকতে হতো যে আমি বললাম "থাক" . কবিগুরুর কবিতা ও উপন্যাস দুটো থেকেই আমি চোখ তুলে নিলাম।  বাবা তখন আমার ঠুলি ঠিক করতে ব্যস্ত।  ছেলে রবীন্দ্রনাথ না শিখলে আর কি শিখবে।  তার থেকে গলায় দড়ি দিক। বাড়িতে তখন নতুন টেপরেকর্ডার এলো।  বাবাই নিয়ে এলো।  সাথে দুটো ক্যাসেট নচিকেতা আর কি একটা আলবাল রবীন্দ্র সংগীতের ক্যাসেট।

এরপর শুরু হলো অত্যাচার।  বাবা রোজ অফিস থেকে ফিরে রবীন্দ্র সংগীত চালিয়ে দিতো। লক্ষ করলাম বাবা আর আমাকে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কিছু বলছে না।  বাড়িতে ধীরে ধীরে ক্যাসেটের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।  যেহেতু বাবার পয়সা বেশি , তাই রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট বেশি আসতে  লাগলো।  আমার এই রবীন্দ্র সংগীতে এতো এলার্জি ছিল সে আর কি বলবো।  ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আর শুনে আসছি সমস্ত জলসাতেই কেউ না কেউ মাইক ধরে কুকুরের কান্না গাইবে।  আর সেটাই লোকে বলবে দারুন।  আমি নাম নিতে চাইনা , লোকেদের মনে দুঃখ লাগবে, কিন্তু নামকরা সব রবীন্দ্রসংগীত গাইয়েরা সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথের গানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। 

আমার কিছুতেই ভালো লাগতো না।  কিন্তু বাবার ওপর চ্যাঁচানো যেত না।  কারণ আমি যখন ঢিনচ্যাক গান চালাতাম তখন বাবা কিছু বলতো না।  এ আমাদের মধ্যে চুপচাপ চিৎকার ছিল।  একদিন রাতে আমি এক বান্ধবীর প্রেমে পরে গেলাম, ধড়াম করে।  পরেরদিন সকালে বাবা নতুন একটা ক্যাসেট এনে চালালো আর তাতে বেজে উঠলো শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের "ভালোবাসি ভালোবাসি" . কি সাংঘাতিক টান ছিলো গানটাতে।  মনের কথা উগলে উঠছিলো।  আমি মাথার পেছনে হাত রেখে সেই যে রবীন্দ্রসংগীত শুরু করলাম।  আজও থামেনি।  প্রতিটা সময়ে প্রতিটি সমস্যায় কোনো না কোনো গান আমার কানের কাছে বেজেই গেছে।  রবীন্দ্রনাথ নাকি স্বয়ং বলে গেছিলেন যে সবাই তাঁর সব সৃষ্টি ভুলে গেলেও গান অমর হয়ে থাকবে । আর এই অমরত্বে বাঁধ সেধেছিল স্বয়ং বিশ্বভারতী । কপিররাইট ওঠার সাথে সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে বিকৃতি শুরু হয় ধীরে ধীরে তা কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় । উৎকৃষ্ট বস্তু যখন সহজলভ্য হয় তখন প্রথমে জথেচ্ছ ব্যাবহার হয় । তারপর প্রকৃতির নিয়মে সে আবার তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করে ।  তখন একের পর এক যুগোপযোগী বাদ্যযন্ত্রের সাথে আধুনিকতা মিশিয়ে চিরনবীন রবীন্দ্রনাথের প্রকাশ ব্যাপৃত হয় শিশু থেকে তারুণ্যে।  সেই বন্যার সময় আমি দেশত্যাগ করি। 

বিদেশের মাটিতে শুধু একটু বাংলা শোনার , পড়ার জন্য মন হু হু করতো।  কিন্তু তখনও ইন্টারনেটে বাংলার প্রচলন নিতান্ত কম।  অথচ জীবনে তখন পরিবর্তনের  তোলপাড়।  নতুন বধূর গৃহপ্রবেশে "তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, একটুকু ছোয়া লাগে সব কি মধুময় লাগতে থাকে সন্ধ্যার মেঘমালার সাথে ।  শুধু ভাবি , এমনি করে যায় যদি দিন যাকনা।  আমার তখন ফাগুন লেগেছে বনে বনে।  ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায় তখন পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে , আমি বলছি ধীরে বউ উতল হাওয়া।  সেকি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ প্রাণেশ হে , আনন্দ বসন্ত সমাগমে। 

কিন্তু সুন্দর চিরস্থায়ী হয় না।  খরবায়ু বেগে বইতে থাকে , আমরা দুজনে দুদিকে ছিটকে পড়ি।  তবু কষে হাল ধরে দীর্ঘদিন এই তরণী বয়ে চলি।  মাঝে মাঝে যখন হাঁফ ছেড়ে সব ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে , তখন একলা চলার গান এসে পেছনে এক লাথি মেরে বলে টুকরো করে কাছি পালে হাওয়া লাগা।  মন তখন মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিক দিগন্তের পারে।  ঝগড়ার মাঝে অসহায় পুরুষ কেঁদে উঠে বলে ভালোবাসা সেকি শুধুই যাতনাময়।  একাকিত্বের দোলায় দুলতে দুলতে সেদিন দুজনের দোলার কথা মনে আসে। 

লিখতে লিখতে রাত ভোর হয়ে যাবে , তবু শেষ হবে না একের পর এক রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব আমার জীবনে। কি বিচিত্র সেই সৃষ্টি , কি বিচিত্র শব্দের খেলা, কি বিচিত্র সুরের সমাগম।  না , ঢং করে সেই প্রাণের কবি , মনের কবি বলতে পারবো না।  কিন্তু জীবনের প্রত্যেক পদে পদে তার ছোঁয়া যে আমার গায়ে লেগে আছে , সেটার অবমাননা করি কি করে। 

যবে থেকে লেখা শুধু করলাম তবে থেকে মনে একটা ভয় থাকতো।  এই কেউ এসে না বলে যে রবীন্দ্রনাথ টুকেছি।  বাঙালির আঁতেল সম্প্রদায়ের এই এক অদ্ভুত চুলকানি। আর এতেই আমি রবীন্দ্রবিরোধী হয়ে পড়ি।  রবীন্দ্রনাথ তার আশপাশের চরিত্র নিয়ে লিখেছে , আমিও তো তাই।  তিনি বিখ্যাত আমি অখ্যাত।  যেমন পৃথিবীতে সাত জন এক রকম হতে পারে।  তাহলে তাদের চরিত্র কেন এক হতে পারে না।  আমার মতো হাজার হাজার লেখক কে গলাটিপে মেরেছে এই রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষগুলো।  যে রবীন্দ্রনাথ মুক্তচিন্তা প্রচার করে গেছেন , তারই পাঠকরা বদ্ধ হয়ে কুক্ষিগত করে রেখেছে তাদের চিন্তাগুলোকে।  কল্লোল  যুগের এই বিদ্রোহ আজও বর্তমান।

না , আমার ভালো লাগেনি চোখের বালি , না ভালো লেগেছে শেষের কবিতা।  অনেক চেষ্টা করেছি , আর এখনোও করে চলেছি।  চব্বিশ খন্ডের রবীন্দ্র রচনাবলী এখনোও আমার কাছে আছে। পরে চলেছি।  কিছু ভালো লেগেছে , কিছু না।  কিন্তু তাদের মতো আমি বলতে পারবো না কার থেকে রবীন্দ্রনাথ ভালো।  রবীন্দ্রনাথ তার নিজের থেকে ভালো - প্রতি পরের পৃষ্টায়। 

শেষ করি তার ছোটগল্প নিয়ে।  আমি দেশে বিদেশের অনেক ছোটগল্প পরেছি , আর পড়েছি সম্পূর্ণ গল্পগুচ্ছ।  নাঃ , এখানেও রবীন্দ্রনাথ এক নম্বরে নয়।  কিন্তু তার সেই বিশ্লেষনি পংক্তি , "নাহি বর্ণনার ছটা , ঘটনার ঘনঘটা , নাহি তত্ব নাহি উপদেশ , অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হয়েও হইলো না আর শেষ।" এর কোনো জুড়ি নেই।  প্রতিটি নভিস লেখক একটা কাঠামো খোঁজে শুরু করার।  তিনি সেই কাঠামো দিয়েছেন ছোটগল্পের।  ছোটোগল্পের ব্যাপ্তি তিনি যে বাঁধনে বেঁধে  দিয়ে গেছেন তার জন্য সত্যি তিনি আমার গুরু।  না কবিগুরু নন, গল্পের গুরু।    

এই হলেন আমার নাইটি পরা ইন্ডিয়ান সান্টা ক্লস যিনি আত্মসমালোচনায় প্রখর আর জগদ্দলের তীব্র নিন্দুক।  তোমরা যে যা বল ভাই , আমার পরান যাহা চাই , ইনি  তাই।  









Wednesday, August 9, 2017

আধ্যানের ডায়েরি - খেলবো না খাবো ?



পুরো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন। এলো , এসে ধরিয়ে দিলো ।  তারপর কি ? খাবো না খেলবো এটা নিয়ে।  সেটা তো আগে বল।  প্রেক্ষাপট, আমার নতুন ডে কেয়ার।  জনতা আমার মতো বেশ কিছু পাবলিক।  আর ওয়ান অ্যান্ড অনলি ভিকটিম , আমি।  এই ডে কেয়ার নিয়ে অনেক কথা বলার আছে।  কিন্তু আরো কিছুদিন থাকি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি তারপরে গুছিয়ে লেখা যাবে।  আপাতত যেটা এখন সবথেকে বড় প্রব্লেম, সেটা হলো আমার খাওয়া।  সে ডে কেয়ারেই হোক, বা পার্টিতেই হোক বা নিজের - একেবারে নিজের ঘরেতেই হোক।  সব জায়গায় আমি হেনস্থা হচ্ছি। 

কোন যে মহাপন্ডিত এসে মায়ের আর বিশেষত বাবার কানে এসে বলে দিয়ে গেছে যে ফিঙ্গার ফুড খাওয়াতে হবে , আর তাতেই দুজনে তুর্কি নাচন নাচছে, সাথে জুটেছে আমার ডেকেয়ারের দুই ডাকিনি আর যোগিনী।  মা ব্যাপারটা বেশ ভালোই সামলাচ্ছিলো।  যেহেতু আমি বাড়ন্ত বাচ্চা। হ্যাঁ,  এখানে আমি কনসিডার করছি,  আমি বাচ্চা।  শরীরের দিক থেকে তো আমি শিশু।  এনালিটিকাল এবিলিটি, কনফিডেন্স আর কমন সেন্স আমার বাকিদের থেকে বেশি হতে পারে বটে, কিন্তু আমার হাড় মাংস সবে বারো চোদ্দ কিলো।  এই পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে হলে, শুধু বুদ্ধি দিয়ে টোকা দিলে হবে না।  এম আর ভি বাড়িয়ে ধাক্কা মারতে হবে।  এইসব নিরেট পাথর কেটে বানানোর মানুষের মাথাগুলোকে টোকা দিয়ে নলেজ ঢোকানো যায় বটে, বাট টু মুভ দেয়ার বাট , আই নিড টু গিভ দেম ধাক্কাস। 

এনিওয়ে , মা আমাকে ভালোই নানা ফ্লেভারের খিচুড়ি করে খাইয়ে দিচ্ছিলো।  আমিও মন দিয়ে টিভি দেখতে দেখতে, কখনো আমার টেবিলে বসে , কখনো মায়ের কোলে শুয়ে খেয়ে নিচ্ছিলাম। আগেও বলেছি , আমার কাছে খাওয়া হলো মোস্ট আনপ্রোডাক্টিভ কাজ।  তাই খাওয়া বাদ  দিয়ে বাকি সব করতে করতে খেতে হবে , এইটা হচ্ছে ব্রিলিয়ান্ট এপ্রোচ।  মা যখন মুখের কাছে ধরে, তখন মায়ের মনে হতে পারে যে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে খাচ্ছি না।  আসলে মা কে ব্যাপারটা বুঝতে হবে যে টিভিতে তখন ভার্সাটাইল ইমোশনের এক্সপ্লোশন হচ্ছে।  যদি আমি দু চারটে ছিটেও গায়ে লাগাতে পারি তাহলে মায়েরই লাভ।  শোকেস করে ঘ্যাম খেতে কার না ভালো লাগে।  কিন্তু না , বাবার জ্ঞান আর ডে কেয়ারের ধাক্কায় মাও গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লো। হুম, এবার ফিঙ্গার ফুড দিতেই হবে। 

এই ফিঙ্গারফুড জিনিসটা প্রথমেই লিঙ্গুইস্টিকালি চটকানো।  ফিঙ্গার চিপস লম্বা লম্বা আঙুলের মতো , ফিশ ফিঙ্গারও আঙুলের মতো , ইভেন লেডিস ফিঙ্গার সবুজ আঙুলের মতো।  কিন্তু ফিঙ্গার ফুড মোটেও কোনো শেপ বা সাইজ মানে না।  ট্যারা ব্যাঁকা করে ফল পাকড় কেটে , বা চন্দ্রপুলির মতো আলু ভাজা , গোল চৌকো কুকি , এমনকি ভাতকেও এরা ফিঙ্গার ফুড বলে চালিয়ে দিচ্ছে।  ইংরেজরা সারা পৃথিবীর ঘড়িতে বারোটা বাজার সাথে সাথে কেটে পড়েছে।  যাইহোক, এই পি ইউ টি পুট আর বি ইউ টি বাট আমাকে মেনে নিতেই হলো।  কিন্তু সমস্যা বাঁধে ভ্যারাইটিতে আর ওয়ে অফ টেকিং এ। 

এ থেকে জেড , অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত খাবার, সব যেন এখন ধীরে ধীরে ফিঙ্গারফুডে পরিণত হতে থাকলো।  আর কিরকম যেন একটা কুকুর মনিব ভাব এসে গেলো বাবা মার মধ্যে।  নিজেরা খাচ্ছে।  আমি গিয়ে দাঁড়ালাম, আর দুচারটে ভাত তুলে, ‘নে টমি খা’। আমারও কি জানি কি হয় , আমিও থেবড়ে বসে ওগুলো তুলে মুখের মধ্যে ঢালার চেষ্টা করি।  ব্যাপারটা আর কিছুই না,  আমার এখন চোখের দৃষ্টি যাকে  বলে আই সাইট দিনে দিনে শার্প হয়ে যাচ্ছে।  সারা কার্পেটে পরে থাকা ছোট ছোট দানা গুলো আমার ছাড়া কার পেটে যাবে? আমি না খেলে ওগুলো হয় পচবে , নয় শুকোবে, দুটোই ওয়েস্টেজ।  তাই আমি রেস্পন্সিবল মেম্বার অফ হাউস হয়ে একটা একটা করে খুঁটে খেতে থাকি। 

কিন্তু এই ভ্যারাইটির চক্করে কোনটা এডিবল, কোনটা টক্সিক আর কোনটা পয়সন সেটা বুঝতে পারিনা।  লম্বা লম্বা বাসমতি চালের ভাত আর বাবার দাঁত দিয়ে নখ কেটে ফেলে রাখা নখ দেখতে প্রায় এক, কিন্তু ডাইজেশনে দুটো স্কেলের দুদিকে।  সর্ষে ইস গুড , কিন্তু মায়ের কানের দুল থেকে ঝড়ে পড়া কালো বিডস খতরনাক। চুল মাথায় থাকলে কোনো সমস্যা নেই কিন্তু পেটে গেলে আর রক্ষে নেই।  সবজি সবই ভালো, কিন্তু নিচে পরে থাকা খোসা নাকি ডেঞ্জারাস। আমি কি আর অতো ছাই বুঝি নাকি। হাজার তার নাম, হাজার তার রূপ।  এখন সব মিলিয়ে ভোকাবুলারি দুশো শব্দ ( বোকা বোকা সাইকোলজিস্টরা গুল দেয় , আর আমি এটাই ইউস করে নেপোয় দই মারি ) . আমার এখন শেপ , সাইজ এন্ড টেস্ট  ইম্পরট্যান্ট , হাইজিন আর এতিকেট নয়।   

কিন্তু সমস্যা আরো।  হয়তো হাইজিনিক পরিস্থিতিতে খাওয়া দেওয়া হলো, কিন্তু এটা বলে দেওয়া হলো না খাবো কি ভাবে , তখন ? আচ্ছা কয়েকটা এক্সাম্পল দিচ্ছি।  দুধ খাই চুষে , চুষলেই গলায় ঢুকে যায়, ওষুধ খাই চেটে , জল খাই মাথা উঁচু করে , মায়ের আঙ্গুল খাই কামড়ে , কিন্তু এই ফিঙ্গার ফুড খায় কি করে। আমার যতদূর জানা ছিল বড়রা এসব খায়না। ওদের খাবারগুলোকে পাম ফুড বলা চলে।  প্রথমে ঢেলে, তারপর চটকে মেখে তারপর গোল গোল করে মুখে ঢালে। আঙ্গুলগুলো পামের সাথে লেগে আছে তাই পামফুড। আচ্ছা,  তাহলে বড় হলে আমি বাবার মতো করে খাবো।  কিন্তু আমি কি বড় নই।  আমি তো মেহেরের থেকে বড় , ঐশীর থেকে বড়।  তাহলে লেটস ফলো দা বড়স, এন্ড মেক ইট বেটার। 

এই ভেবে পরের দিন ডে কেয়ারে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম লাঞ্চের। কেউ জানেনা আমি কি করতে চলেছি।  যদিও আমার বন্ধুদের বিশেষ যায় আসে না, কারণ তারা আমার থেকে একটু বেশি পাকা। এরা সব কিছু আগে থেকে শিখে এসেছে।  মনে হয় ওরা এখানে আসার আগে অন্য কোনো স্কুলে দু তিন ঘন্টা থেকে আসে।  ওরাও খায়, কিন্তু আমি ঠিক ওদের খাওয়া বুঝতে পারিনা।  চামচ দিয়ে খায়।  ফিঙ্গার ফুড খেতে দেয় , সবার হাতে দশ দশটা আঙ্গুল অথচ সবাই একটা চামচ নিয়ে খোঁচা মেরে মেরে খায়, জাস্ট ভোগাস।  এরা নাকি দেশের ভবিষ্যৎ।  অপ্টিমাইসড ইউস অফ ন্যাচারাল রিসোর্সেস না হলে কি আর দেশোদ্ধার হয়।  যাইহোক দেশের প্রেসিডেন্ট একটাই হয়। 

শেষমেশ খাওয়া এলো।  লাল, সাদা, সবুজ , গোল চৌকো , ত্যাবড়া আর থ্যাবড়া।  একবার চোখ বুঝে মা বাবার খাওয়া স্মরণ করলাম।  তারপর প্রথম কাজ হলো বাটি  উল্টে দেওয়া।  ডিসিশনে একটু লেট্ হয়ে গেলো কারণ বাটি নেই।  একটা থালার  ওপর গোল গোল খাঁজ কাটা।  ব্যাপারটা তো বাবার প্লেটে নোটিস করিনি।  যাহোক মেন্ মুদ্দা হলো , প্রথমে উল্টোতে হবে।  তাই পুরো থালাটা উল্টে দিলাম।  সমস্ত কিছু গিয়ে পড়লো টেবিলে।  কোনো প্রব্লেম নেই।  এবার কাজ হচ্ছে চটকানো।  বাবাকে আলুভাতে মাখতে দেখেছি।  প্রথমে যেটাই একটু বসে থাকবে তার ওপর তালু দিয়ে জোরে চাপ দিলে শুয়ে যাবে, এই হোলো লজিক।  আমি একটু আলাদা ভাবে তালু দিয়ে মারলাম এক থাপ্পড়।  একদম সাকসেসফুল সবুজ সেদ্ধ বিনস একনিমিশে থেঁতো হয়ে গেলো।  এরপর বাকি সব গুলো একে একে থেঁতলে তারপর চটকাতে থাকলাম।  বেশ সব কিছু মিলে মিশে এক রামধনুর সৃষ্টি হলো।  ব্রেভো আধ্যান ব্রেভো।  এরপর মাখা।  মাখা আর কিছুই নয় এদিকের জিনিস ওদিকে ঘষে ঘষে নিয়ে যাওয়া, আর তারপর সবগুলোকে মিশিয়ে দেওয়া।  আমার আর ক্লারার টেবিল জোড়া।  আমি ভাবলাম লেটস হেল্প দা পুওর লেডি।  ওর টেবিল থেকেও টেনে টেনে ঘষে ঘষে আমার টেবিলের জিনিসের সাথে মাখিয়ে দিলাম।  এবার খাওয়া। 

কিন্তু ওটা কি।  একটা গোল মতো জিনিস।  সবাই সসেজ সসেজ বলছে।  কোনো রকমে জিনিসটা হাতে তুললাম।  আমার গাড়ির চাকার মতো।  দেখতেও ওরকম কিন্তু গন্ধটা বেশ "আয় খা , আয় খা " মতো।  এটা নিয়ে কি খেলবো না খাবো।  সবাই দেখছি সেই চামচ দিয়ে খোঁচানো শুরু করেছে।  তাহলে আমাকেও খেতে হবে।  আমার কিন্তু সেই মেথডিকাল এপ্রোচ। ঢালা, থ্যাঁতলানো , চটকানো , মাখা  দেন খাওয়া। 

টেবিলে ফেললাম , মারলাম এক থাপ্পড় কিন্তু ব্যাটা শুয়ে পড়ল না, উল্টে আমার হাতটাই কিরকম নোনতা আর চকচকে হয়ে গেলো।  একটু চেটে নিয়ে দেখলাম।  বেশ খেতে, নোনতা নোনতা।  কিন্তু এটা তো থ্যাঁতলানো গেলো না , মাখব কি করে। ঠিক আছে , অনেক ভেবে বার করলাম যে এক্সেপশন বা ব্যতিক্রম তো থাকতেই পারে।  যেমন সবকটা মূর্খদের মাঝে আমি পন্ডিত। তাই আমি এবার ওটা হাতে তুলে নিলাম। এবার সোজা মুখে ঢুকিয়ে দেব।  ওয়ান - টু - থ্রি।  একি, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে কেন?  আর আমি স্বাদ পাচ্ছি না কেন।  মা যখন খাওয়ায় বা একটু আগেই তো খেলাম, নোনতা নোনতা। কিন্তু এখন স্বাদ পাচ্ছি না কেন?  আর কানেও যেন কম শুনছি।  বাঁ হাত দিয়ে তুলেছিলাম , কিন্তু সেটা মুখে পৌঁছয়নি।  কানে গেছে।  কি লজ্জা,  কি লজ্জা। আসলে মাথাটার খেয়াল আছে , কিন্তু মাথার কোথায় মুখটা সেটা সব সময় ঠিক ঠাওর করতে পারিনা।  বাবা যখন খিচুড়ি খাওয়ায় আসলে মুখ, নাক , কান সব কিছুই ইউস করতে হয়।  তাই মাঝে মাঝে একটু আধটু গন্ডগোল হয়ে যায়।  কুচ পরোয়া নেই আধ্যান, কান টানলেই মাথা আসে।  আর মাথাতেই কান আছে।  আর কানে শুনলেই মুখে বলা যায়।  তার মানে কানের কাছাকাছি মুখ আছে।  শুধু খাবারটা টানলেই হলো। 

টানতে টানতে নিয়ে এলাম সসেজটাকে এক জায়গায়, দেখলাম সবাই থমকে দাঁড়িয়েছে।  সবার চোখ আমার দিকে।  তার মানে ওটাই মুখ।  এবার ফিঙ্গারে প্রেসার দিলেই ব্যাপারটা আলতো করে মুভ করে যাবে জিভের মধ্যে।  একটু চাপ দিলাম , কিন্তু কৈ এখনো তো কোনো স্বাদ নেই।  আরেকটু চাপ দিলাম , তাতেও কিছু হলো না।  কিন্তু এবার আবার সবাই হেসে ফাটিয়ে দিলো।  আমি লাল হয়ে গেলাম চেষ্টা করতে করতে।  বেশ কিছুক্ষন ধস্তাধস্তি করেও যখন ঢুকলো না ভেতরে , তখন জোয়ান্নার দিকে তাকাতে বুঝলাম আমি কান আর মুখের মাঝখানে যে গালটা আছে সেটাতেই ঢোকানোর চেষ্টা করছি।  লজ্জায় মাথা আরো নিচু হয়ে গেলো।  কিন্তু শুরু করা কাজ, আমায় শেষ করতেই হবে।  আবার পথ চলা শুরু।  কিন্তু মুখের কাছে আসতেই থপাস।  হাত থেকে গেলো পরে।  এবার সোজা মুখে পুরবো।  একটু হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিলাম নোংরা হয়ে যায়নি তো।  দেখলাম,  না , বেশ ঠিকই আছে।  কিন্তু সোজা মুখে পুরতে যেতেই আমার হাত চেপে ধরলো ডাকিনি যোগিনীর একজন।  লাঞ্চ টাইম শেষ।  এবার উঠে পড়তে হবে।  আমার তখন তীরে এসে তরী ডোবার মতো অবস্থা।  এতো কষ্ট করে স্টেজ তৈরী করে পা ভেঙে ফেললাম নাচার আগেই।  গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করলো , কিন্তু আবার সেই প্রেস্টিজ আমার সামনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো।  আর ওই শশী , শিবা , ক্লারা , জনি সবাই আমার দিকে তাকিয়ে খ্যা খ্যা করে হাঁসতে লাগলো।             

এই নন প্রোডাকটিভ কাজে আমাকে জোর করে ঠেলে দেওয়ার কারণ ফাঁকিবাজি।  কাজ করবো না, তাই এই মহান বাণী বেরোয় মা দের মুখ থেকে , "নিজে খেতে শেখো।" এইটুকু কাজ করতে এতো অনীহা। আর এই অনীহার জন্য আমাদের মতো ইন্টেলিজেনট শিশুদের এরকম বার বার ইন্সাল্ট হতে হয় সোসাইটির কাছে।  ওরে গাছকেও ঠেকনা দিতে হয় দাঁড়ানোর জন্য।  একটু না হয় বড় বয়স পর্যন্ত খাইয়ে দিলি।  তাতে কি গায়ে জ্বর আসে।  আর এই বাবা , এখনো তো মাঝে মাঝে আমার মা তোমাকে খাইয়ে দেয় তখন কি মা বলে "নিজে খেতে শেখো। " আমার সর্বসমক্ষে যা ইনসাল্ট হয়েছে সেটার জন্য তোমরা দায়ী।  যাইহোক ল্যাজ তো আর সোজা হবে না তাই আপাতত রাখি, আমি আর জাস্ট নিতে পারছি না।  শুধু একটাই রিকোয়েস্ট , কোনটা খাবো আর কোনটা নিয়ে খেলবো সেটা এটলিস্ট বলে দিয়ো।

আধ্যানের ডায়েরি আগের পাতাগুলো