Tuesday, August 15, 2017

আধ্যানের ডায়েরী - নেরুদা




দিলো রে দিলো।  সব চুলগুলো কেটে দিলো।  ব্যাপারটা আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি।  অনেক দিন ধরেই মন কষাকষি, মারামারি , আজ নয় কাল চলছিল।  কিন্তু তোমরা এরকম করে আমায় টাকলু করে দেবে সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। 

বেশ কয়েকদিন ধরেই আমার  খুব ঠান্ডা লাগছিল ।  মানে যাকে বলে, রানিং নোস।  মানে একেবারে ভরভরে।  নাক আমার বেশ কিছুদিন থেকেই  বন্ধ। কোথা থেকে যে এই ট্রান্সপারেন্ট সেমি সলিড আমার নাকের মধ্যে এসে জমা হয় বলতে পারিনা বাবু।  মাঝে মাঝেই দুধ খাওয়ার সময় আউট অফ ব্রিদ হয়ে যাই।  তখন দুধের বোতল ঠেলে সরিয়ে, প্রাণ ভরে, মুখ হাঁ করে নিঃস্বাস নিতে হয়।  সেই নিস্বাসে যে কি শান্তি সে আর বলতে। একটু গ্রামাটিকালি গন্ডগোল হয়ে গেলো বটে।   ওটা প্রস্বাস।  নিশ্বাস মানে যেটা ছাড়া হয়।  সমস্যা যদিও সেটাতেও।  তখন আবার দম ছাড়তে গেলে প্রচন্ড এক চাপ দিতে হয়।  যদিও ইনভিসিবল নিস্বাসের সাথে ভিসিবল পোঁটা থ্যাক করে বেরিয়ে আসে।   দৃশ্যদূষণ হতে পারে বটে কিন্তু আমার কিছু করার নেই , আগে হেলথ তারপর এটিকেট। 

নাক থেকে এগুলো বেরিয়ে এসে আমায় মুক্তি দেয়না।  মা বা বাবা যদি কাছে না থাকে তাহলে সেগুলো আবার আটকে যায় গালে।  হাত দিয়ে ঘষে দিলে মাঝে মঝে আবার চুলেও আটকে যায়।  সেগুলো শুকিয়ে আবার সাদা হয়ে যায়।  আমার এই সাদা চামড়ায় আরো সাদা হয়ে নুনের ড্যালার মতো দেখতে লেগে।  আমি চেটেও দেখেছি , বেশ নোনতা নোনতা।  যাইহোক।  দ্যাটস নট দা পয়েন্ট।  মুদ্দাটা হলো এই সর্দি হওয়া নিয়ে মা আর বাবার মধ্যে ঝগড়া। 

মায়ের মতে, আমার চুল বড় হয়ে গেছে তাই  স্নানের জল শুকোতে সময় লাগে।  সেই ঠান্ডা জমে নাকি আমার সর্দি হয়।  আমি ভাবলাম ইট মে বি এ কস।  যখন এই সর্দি বেরোয় তার কিছুদিন আগে থেকে বেশ ঠান্ডা লাগতে আরম্ভ করে বটে ।  কিন্তু বাবা তো ইন্টারনেট , সব কিছুর একটা পাল্টা উত্তর রেডি।  বাবার মতে এই শুকনো ওয়েদারে সর্দি গর্মি হয় না। বাবার নাকি এখানে কখনো ঠান্ডা লাগেনি।  ভারী আমার ভীমসেন।  নিজেকে জাহির করার একটা সুযোগও ছাড়ে না।  কিন্তু এই ব্যাপারে আমার মন যেন বাবাকে সায় দিলো। আসলে এই সুন্দর কার্তিকের মতো চুলের বদনাম ঠিক ভালো লাগে না। 

চুল কিন্তু আমার একদম জব্বর।  এক কালে প্রশ্ন উঠেছিল চুলটা ঠিক কার বাড়ির মতো হবে।  মায়ের বাড়ির মতো না বাবার বাড়ির মতো খোঁচা খোঁচা।  কিন্তু আমি তো আমার মতো।  তাই শেষমেশ আমার নিজের মতোই লম্বা লম্বা কোঁকড়ানো সুন্দর চুল হয়েছিল আমার।  এই একটা জিনিসে বাবা মার্ দুজনার ঝগড়া কয়েকদিন রোকা গেছে।  কারো দিকে হেললেই সমস্যা।  সবাই আমাকে তাদের বাবার সম্পত্তি মনে করবে।  কিন্তু টেকনিক্যালি আমি যখন নিজের বাবারিই সম্পত্তি নই তখন কারোকে স্বত্ব দিতে আমার বিশেষ মন বা মানসিকতা নেই। 

যাইহোক কাম ব্যাক টু চুল।  পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সমস্ত মানুষের মতে , এই চুল আমার কিউটনেস বা বিউটি কে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছিলো ।  হবে না কেন।  আমার দেশে তো সবাই টাকলা।  ইভেন মা, যার নাকি পাছা ছাড়ানো চুল ছিল, সেও তো রিঠা, শিকাকাই, দেশি বিদেশী , একটিভ ভিটামিন প্রো ভি সব কিছু চেষ্টা করেও প্রতি সপ্তাহে বাথটব থেকে মুঠো মুঠো চুল বার করতো। সেই আকালের দেশে আমার সুরক্ষিত কালে মেরে  বাল , নানা এটা ভ্যাসমলের কেরামতি না, অন্দরুনি তাকত। এই সেই চুল যেটা আমি পেটের ভেতর থেকে নিয়ে এসেছি ।  টেকনিক্যালি এটা শুধু আমার আর মায়ের ক্রেডিট।  মা বলে এই দুটো চুল নাকি প্রায় চার পাঁচ ঘন্টা আগে থেকে দেখা যাচ্ছিলো যখন আমি বেরোয়নি।  সে থাক।  চুল আমার মসৃণ এবং এট্রাক্টিভ।  যখন আস্তে আস্তে বড় হয়ে গেলো।  তখন এক এক সময় আমাকে এক একজন সেলিব্রেটির মতো দেখতে লাগলো।  যখন স্নান করতাম তখন বাবা বলতো মোগলির মতো লাগছে।  যখন মা চুল শুকোতো তখন মায়ের ব্লোয়ারের সামনে বসে থাকলে বলতো  টম ক্রুসের মতো চুল।  কিন্তু আঁচড়ে দিলে বলতো "একেবারে চুমকু সোনা লাগছে। " কি বিচ্ছিরি নাম।  চুমকু ? চুমকু মানে কি।  তীব্র আপত্তি পাত্তা পায়নি।  কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগতো না উপমাটা। 

তবে আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলতাম আমার চুল মেঘের মতো।  দেখো ছোট চুলে স্টাইল হয় না।  স্টাইল করতে গেলে চুল বড় করতেই হয়।  ছোট চুলের একটাই স্টাইল - বাধ্যতা। উকুন , ড্যানড্রাফ আর গরমের জ্বালায় এই স্টাইলের উৎপত্তি।  আর আমি মনে করি ওটা চোরেদের  স্টাইল।  ধরতে যাতে না পারা যায় তার জন্য এই স্টাইল। আমি চোর নই, তবু মাঝে মাঝেই যখন আমি কিছু ভেঙে ফেলি তখন মা বলে চোর চোর তাকাচ্ছি।  চোর কি করে তাকায় সেটা তুমি কি করে জানলে বাপু।  একবার যদি চোর চোর কোথাও সাউন্ড পাও , তাহলে তো আমার থেকেও সিলি মুখ করে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলো।  জবরদস্তি আমাকে চোর বানিয়ে চোর স্টাইল চুল কেটে দেওয়া, আনবিলিভেবল ঔদ্ধত্য।

আমাদের  বেডরুমে বেশ কয়েকটা ছবি আছে।  তার মধ্যে একজনের সঙ্গে আমার চুলের হেবি ম্যাচ।  আমি অনেকবার তাকে ছুঁতে গেছি। কিন্তু মা বাবা শকুনেরও অধম।  সব সময় ছোঁ মেরে আমাকে তুলে নিয়ে বলে "নো এটাক"।  ওটা আমাদের ইষ্টদেবতা।  হোয়াট ইস ইষ্ট ? ওটা তো কেষ্ট বা কিন্ন।  আমার সেই কিন্নর মতো চুল।  এই তো সেদিন নিউ ইয়র্ক গেছিলাম।  সে গল্প পরে শোনাবো।  সেখানে গিয়ে আমার চুলের আসল মহিমা বুঝতে পারলাম।  যখন খুব হাওয়া দেয় তখন চুল কি সুন্দর ওড়ে।  আর কানের কাছে আর মাথার ওপর কিরকম সুড়সুড়ি লাগে।  বাবা আবার সুড়সুড়ি চ্যাম্পিয়ন।  ঠিক বোঝে কোন জায়গায় আঙ্গুল বোলালে সুড়সুড়ি ভালো লাগে। সবাই যখন সুড়সুড়ি দেয় তখন সারা মাথায় হাত ঘষতে থাকে।  সেটা রাইট এপ্রোচ নয়।  জার্নি শুড স্টার্ট ফ্রম প্লেন ল্যান্ড, এন্ড হোয়েন ল্যান্ড মিটস দা মাউন্টেন ,দেন অনলি হ্যাপিনেস কামস।  আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে কাঁধ থেকে চুল পর্যন্ত তুলে নিয়ে যেতে হবে।  তখনি আসবে ঘুমের আমেজ।  এই ব্যাপারে বাবাকে থ্যাঙ্কস।  হি অলোয়েস ডাস ইট রাইট।    

বাবার তীব্র লজিকাল আপত্তিও যখন পাত্তা পেলো না।  তখন বাবা আরো লজিক ইমপ্লিমেন্ট করে বললো যে আঠারো মাস না হলে চুল কাটতে নেই।  মা সেই একরোখা বাঘিনী।  বাবাও নাছোড়বান্দা।  তোমারও নয় আমারও নয় , বেজোড় মাসে কাটতে হয়।  বাবা ওয়াস ট্রাইং টু বায় সাম টাইম।  এটা বাবার চিরাচরিত টেকনিক।  বাবার মতে একটু সময় কিনে নিতে পারলে, পরে টপ আপ করতে বেশি খাটতে হয় না।  কিন্তু মা সুগার হিম বোন টু বোন।  মা বললো তাহলে কোনটা ক্যালকুলেট করতে হবে - কমপ্লিটেড না অনগোয়িং।  মানে আমি চোদ্দ মাস কমপ্লিট করেছি আর পনেরো মাস চলছে।  বাবা এই যুক্তিতে চুপ।  আর কোনো ট্যাঁ ফোঁ নেই। 

দিনটা এসে গেলো। আমার কোনো আইডিয়া ছিল না।  গত সপ্তাহ থেকে কোথাও একটা যাওয়ার প্ল্যান হচ্ছিলো।  কোনো একটা জায়গা, যেখানে নাকি আমি আগে গেছি কিন্তু আবার যাওয়া যাবে।  আমার আর কি আমার ঘুরতে যেতেই ভালো লাগে।  বেশ লাগে।  তাই সবাই জামাকাপড় পড়লেই আমার হৃদয় নেচে ওঠে।  আমি তো ম্যান, আমার মধ্যে অতো জটিলতা নেই।  আমি ভাবলাম সবাই যখন বেশ সুন্দর জামা কাপড় পরে নিয়েছে তাহলে আমরা শেষমেশ ঘুরতে যাচ্ছি। বিশাল উত্তেজনা নিয়ে গাড়িতে উঠলাম।  গাড়ি চলতে লাগলো আর নিমেষের মধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। 

বেশিক্ষন হয়নি হঠাৎ কোমরের কাছে টানাটানি হতে বুঝলাম ডেস্টিনেশন রিচড। আমি নরমালি ঘুম থেকে উঠে একটু আড়মুড়ি ভাঙি কিন্তু যেহেতু এন্টারটেইনমেন্ট ইস দা প্রায়োরিটি তাই আমিও সজাগ এবং উত্তেজিত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে দেখি ভোঁ ভাঁ।  একটা ফাঁকা পার্কিংলটে দাঁড়িয়ে আছি।  ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাবা মা কে ফলো করতে লাগলাম।  মা একটা দোকানে গিয়ে ঢুকলো।  আমার ব্যাপারটা ঠিক ভালো ঠেকলো না।  সিক্সথ সেন্স বলে তো একটা জিনিস আছে।  সেটা আবার আমার একটু বেশি স্ট্রং।  কিন্তু পিছু তো ফেরা যাবে না।  তাই বাবার হাত ধরে ঢুকে পড়লাম দোকানটাতে। 

বেশ মজাদার দোকানটা। নানা রঙ দিয়ে সাজানো একটা জঙ্গল টাইপের।  মজাদার সব গান বাজচ্ছে।  কোথাও বাঁদরের ছবি, কোথাও জিরাফের।  উঁচু নিচু সব খেলার জায়গা।  তার মাঝে এক দুজন আবার বসে আছে।  আর চুল কাটছে।  ও হরি।  তারমানে এবার আমারও ঘ্যাচাং ফু।  ডুকরে কেঁদে উঠতে  আমার থেকে এক হাত লম্বা একটা ছেলে এসে কিরকম লম্ফো ঝম্প করতে লাগলো।  আর আমার সাথে টুকি টুকি খেলতে লাগলো।  আমার বেশ মজা লেগে গেলো।  এই টুকি টুকি খেলাটা হেব্বি মজাদার।  এখানে আবার বলে পিক এ বু।  নতুন শিখেছি তাই সবার সাথে খেলতে বেশ মজা লাগে।  কিন্তু মাঝখানে আমায় থামিয়ে বাবা কোলে তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলো চেয়ারে। 

বসানোর সাথে সাথে একটা মহিলা এসে হাজির হলো।  আমার সাথে বেশ কিছুক্ষন হাসি হাসি মুখ করে অনেক কিছু খেলার চেষ্টা করলো, হুইচ ইস সিম্পলি বোরিং। তারপর একটা মেশিন বার করতেই আমি ব্যাপারটা বুঝে গেলাম।  তারপর শুরু হলো স্ট্রাগল আর ডিফেন্স।  কিন্তু বিভীষণের জন্যে রাবণকেও হার মানতে হয়েছিল।  মা ধরলো দুটো হাত , বাবা ধরলো থুতনি।  আমি নট নড়ন ,নট চরণ।  আর কি বলি।  আমার সুন্দর চুল , নিমেষে ভূমিতে মিশে গেলো।  কিছুক্ষনের মধ্যেই মাথা হালকা।  এর মধ্যে আবার ঢং করে ছবি তুলে সেটা আবার প্রিন্ট করা হলো।   ফার্স্ট হেয়ারকাট।  তারপর সেটাকে আবার একটা কার্ডের মধ্যে রেখে বাবাকে দিয়ে দিলো। 

বাবা , সেই বাবা ,যে আমার চুলের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছিলো , সেইই বিস্বাসঘাতকতা করলো।  মানছি পুরুষ মানুষদের অনেক কিছু মেনে নিতে হয়।  কিন্তু তারপর ন্যাকামো করতে তো কেউ বলেনি।  চুল কাটার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেলো , "কি সুন্দর লাগছে।  আমার নেরুদা।  আমার ছোট্ট টিবেটান মংক, আমার ওল্ড মংক। " আমি জাস্ট নিতে পারছিলাম না, ওই ন্যাকামোগুলো। নেরু , টাকলা , গাঞ্জা এসব এবার আমায় শুনতে হবে।  আদো আদো গলায় বললেই সবকিছু কিউট আর একসেপ্টেড হয় না। দোস সাউন্ডস এস ইরিটেটিং এস ইট ফিলস।  কিন্তু কিছু করার নেই।  দুর্ঘটনা ঘটার পর যদি সেটা মেনে না নেওয়া যায় তাহলে বুকের রক্ত গলায় উঠে যায়।  সেটা আর নামতে চায় না।  আমার তখন রাগে, ক্ষোভে মাথা ঝাঁ ঝাঁ  করছে।  কিন্তু গাড়ির ওপর আমার রিফ্লেকশন দেখে আমার বেশ মজা লাগলো। 


নাহ , খুব একটা কুৎসিত লাগছে না।  বরং বেশ সুন্দরই লাগছে।  বাবা ঠিকই বলেছে।  ছোট্ট মঙ্কের মতো লাগছে।  কিন্তু বাবা , স্পেশালি মা শোনো ভালো করে , নাম রেখেছো আধ্যান,  চুল কেটে মংক এর মতো বানিয়ে দিলে।  এবার যদি সেই মঙ্কের মতো যে নিজের ফেরারি বেচে চলে গেছিলো তিব্বতে তার মতো গৃহত্যাগ করি তখন কি করবে? দিস টাইম ফার্স্ট মিস্টেক পার্ডনড , কিন্ত কনসিডার ইট এস এ সিরিয়াস থ্রেট। পরের বার যদি হয়েছে এরকম, তাহলে কিন্তু টাটা বাই বাই।  হাজার কাঁদলেও উপায় নাই।  এই বলে রাখলাম।    

আধ্যানের ডায়েরির আগের পাতাগুলো 

Monday, August 14, 2017

শঙ্খচিলের ক্ষুধা

এ আগুন , নিঃস্ব সাজায় শঙ্খচিলের বেড়া,
জানিনে কালকে আমার গতি , হয়তো পড়বে ধরা।
স্বার্থক খাদ্য হয়ে তৃষার আগুন করিব স্নিগ্ধ ,
অর্ধ পচন সারে জ্বলিব অর্ধ দগ্ধ।
আজ হবে কাল , বিষাদ রবে , সাঙ্গ হবে শান্তি।
কালকে আমি শঙ্খচিলের , সফেদ ভুলভ্রান্তি।
আকাশ থেকে পড়বে খসে শঙ্খচিলের ক্ষুধা ,
রক্তমুখে ফিরবে আকাশে অন্তঃ নির্দ্বিধা।
কেউ রবে না আমার পাশে , কেউ রবে না চিৎকারে।
একই আমি পড়ব খসে মৃত্যূকূলের সংসারে। 

Friday, August 11, 2017

আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ




হেঁ হেঁ , হেঁ হেঁ  রবি ঠাকুর।  তাইতো তাইতো।  লিখতে তো হবে রবি ঠাকুর নিয়ে।  তাও আবার আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ।  আমি আবার রবীন্দ্রবিরোধী।  পার্লামেন্ট এ বামপক্ষ না থাকলে খেলা  জমবে কি করে।  সবাই হাতে কাদা , পচা টমেটো , নিজের না হলেও অন্যের বিষ্ঠা নিয়ে পড়তে আরম্ভ করো। 

আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ বাংলার আর দশটা লোকের থেকে খুব একটা বেশি বা কম জড়িয়ে নেই।  কুমোর পাড়ার গরুর গাড়িতে কে না চড়েছে।  জোর করে নাকে মুখে ঠুসে রবীন্দ্রনাথ নামক আলুভাতে সবার পাতেই কম বেশি পড়েছে।  যখন থেকে বোঝার ক্ষমতা হলো তবে থেকে দেখছি বাড়ির শোকেসে বিশাল রবীন্দ্র রচনাবলী।  কেউ পড়েনা।  পড়লেও পুরোটা পড়া কারো পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি , কিন্তু কথায় কথায় , "ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে " ঝাড়তে কেউ ছাড়ে না।  বিশেষত রেজাল্ট বেরোনোর আগে। 

প্রতি বছর বাংলা পরীক্ষা এক জীবনযন্ত্রণার সূত্রপাত ঘটাতো।  বাংলা বলতে ভালো লাগে , শুনতে ভালো লাগে কিন্তু লিখতে , ইশশশ । লোকে বড় হওয়ার অপেক্ষা করে স্বাধীনতা, পয়সা আর প্রেয়সীর জন্য । আমি অপেক্ষা করতাম , কবে বড় হব আর বাংলা পরীক্ষা দিতে হবে না । ওই সমচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দযুগলের অর্থপার্থক্য নির্ণয় আমার রাতে ঘুমের মধ্যে এসে চিমটি কাটত। আর ছিল রচনা বউদির ডিমান্ড । ওয়ার্ড লিমিট আরেক হুল ।  জ্ঞানীরা চাইতো আরো বেশি বেশি শব্দ।  আর আমি চাইতাম যত কম হোক।  আমার দ্বারা ভাব সম্প্রসারণ হতো না, হতো সংকোচন।  তাই সাহিত্য বলতে রহস্য রোমাঞ্চ সেই বয়সে অতিরিক্ত প্রিয় ছিল।  হঠাৎ করে পরীক্ষার আগে এক হাওয়া এলো যে, রচনায় যদি কোটেশন দেওয়া যায় তাতে নাকি নম্বর বেশি পাওয়া যায়।  আমার আবার মুখস্থ করতেও গায়ে জ্বর আসতো।  কোনো ভাবে মুখস্থ করে নিলেও সেটা ভাবের প্যান্ট পরিয়ে ঠিক জায়গায় চেন বসিয়ে টানা আমার কাছে ভবিষ্যতের মতো - অন্ধকার।  কিন্তু এই সময় শরীরে কিছু ঢেউ খেলার কারণে মাঝে মাঝে ছন্দ মিলিয়ে দু চারটে কবিতাও লিখে ফেলেছিলাম।  মাথায় এলো ফন্দি।  পরীক্ষার খাতায় ফটাফট দুটো লাইন ঝেড়ে দিয়ে নিচে লিখে দিতাম রবীন্দ্রনাথ বলেছেন।  এটুকু কনফিডেন্স ছিল যে কেউ রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কবিতা পড়েনি, আর পড়ে থাকলেও মুখস্ত রাখা ইম্পসিবল। রেজাল্ট বেরোনোর পর খাতা দেখার দিন রবীন্দ্রনাথকে যে কি ভাবে থ্যাংকু বলেছি সে আর এখানে লিখছি না। 

এরপর ধীরে ধীরে শরীরে ও মনে হাজার হাজার পরিবর্তন এলো।  যে কোনো মেয়েকে দেখে ভালো লাগতে শুরু করলো।  সব কিছুই ছন্দময়। প্রচুর কবিতা লিখতে আরম্ভ করলাম।  কিন্তু কবিগুরুর কবিতা যেই পড়তে আরম্ভ করলাম আমার বমি পেতে আরম্ভ করলো।  এই গুলো কবিতা বলে ? কি স্লো , কি বেকার। এর থেকে রগরগে নজরুল আর বাংলা ব্যান্ড তো অনেক ভালো।  সেই বয়সটা এমন থাকে , যে লোকের ন্যাকামো সহ্য হয় না।  আর আমারও তখন রবীন্দ্রনাথের ওই ন্যাকা ন্যাকা কবিতা গুলো ভালো লাগতো না।  বীররস বা  স্বাধীনতা সম্বন্ধীয় কবিতাগুলো মন কাড়তো বটে , কিন্তু সে আর কটা। 

বন্ধুরা তখন প্রেমে চুপচুপে।  সবাই শেষের কবিতা শেষ করছে।  আমি পড়ে তো থ।  উপনাস্যেও নেকিয়েছে ?  অমিত আর লাবন্যর মতো বেকার নাম আমি কিছুতেই ক্যারেক্টার হিসেবে মেনে নিতে পারিনি।  তার ওপর যে ডায়লগের গভীরতা।  এতো গভীরে ঢুকতে হতো যে আমি বললাম "থাক" . কবিগুরুর কবিতা ও উপন্যাস দুটো থেকেই আমি চোখ তুলে নিলাম।  বাবা তখন আমার ঠুলি ঠিক করতে ব্যস্ত।  ছেলে রবীন্দ্রনাথ না শিখলে আর কি শিখবে।  তার থেকে গলায় দড়ি দিক। বাড়িতে তখন নতুন টেপরেকর্ডার এলো।  বাবাই নিয়ে এলো।  সাথে দুটো ক্যাসেট নচিকেতা আর কি একটা আলবাল রবীন্দ্র সংগীতের ক্যাসেট।

এরপর শুরু হলো অত্যাচার।  বাবা রোজ অফিস থেকে ফিরে রবীন্দ্র সংগীত চালিয়ে দিতো। লক্ষ করলাম বাবা আর আমাকে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কিছু বলছে না।  বাড়িতে ধীরে ধীরে ক্যাসেটের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।  যেহেতু বাবার পয়সা বেশি , তাই রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট বেশি আসতে  লাগলো।  আমার এই রবীন্দ্র সংগীতে এতো এলার্জি ছিল সে আর কি বলবো।  ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আর শুনে আসছি সমস্ত জলসাতেই কেউ না কেউ মাইক ধরে কুকুরের কান্না গাইবে।  আর সেটাই লোকে বলবে দারুন।  আমি নাম নিতে চাইনা , লোকেদের মনে দুঃখ লাগবে, কিন্তু নামকরা সব রবীন্দ্রসংগীত গাইয়েরা সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথের গানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। 

আমার কিছুতেই ভালো লাগতো না।  কিন্তু বাবার ওপর চ্যাঁচানো যেত না।  কারণ আমি যখন ঢিনচ্যাক গান চালাতাম তখন বাবা কিছু বলতো না।  এ আমাদের মধ্যে চুপচাপ চিৎকার ছিল।  একদিন রাতে আমি এক বান্ধবীর প্রেমে পরে গেলাম, ধড়াম করে।  পরেরদিন সকালে বাবা নতুন একটা ক্যাসেট এনে চালালো আর তাতে বেজে উঠলো শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের "ভালোবাসি ভালোবাসি" . কি সাংঘাতিক টান ছিলো গানটাতে।  মনের কথা উগলে উঠছিলো।  আমি মাথার পেছনে হাত রেখে সেই যে রবীন্দ্রসংগীত শুরু করলাম।  আজও থামেনি।  প্রতিটা সময়ে প্রতিটি সমস্যায় কোনো না কোনো গান আমার কানের কাছে বেজেই গেছে।  রবীন্দ্রনাথ নাকি স্বয়ং বলে গেছিলেন যে সবাই তাঁর সব সৃষ্টি ভুলে গেলেও গান অমর হয়ে থাকবে । আর এই অমরত্বে বাঁধ সেধেছিল স্বয়ং বিশ্বভারতী । কপিররাইট ওঠার সাথে সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে বিকৃতি শুরু হয় ধীরে ধীরে তা কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় । উৎকৃষ্ট বস্তু যখন সহজলভ্য হয় তখন প্রথমে জথেচ্ছ ব্যাবহার হয় । তারপর প্রকৃতির নিয়মে সে আবার তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করে ।  তখন একের পর এক যুগোপযোগী বাদ্যযন্ত্রের সাথে আধুনিকতা মিশিয়ে চিরনবীন রবীন্দ্রনাথের প্রকাশ ব্যাপৃত হয় শিশু থেকে তারুণ্যে।  সেই বন্যার সময় আমি দেশত্যাগ করি। 

বিদেশের মাটিতে শুধু একটু বাংলা শোনার , পড়ার জন্য মন হু হু করতো।  কিন্তু তখনও ইন্টারনেটে বাংলার প্রচলন নিতান্ত কম।  অথচ জীবনে তখন পরিবর্তনের  তোলপাড়।  নতুন বধূর গৃহপ্রবেশে "তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, একটুকু ছোয়া লাগে সব কি মধুময় লাগতে থাকে সন্ধ্যার মেঘমালার সাথে ।  শুধু ভাবি , এমনি করে যায় যদি দিন যাকনা।  আমার তখন ফাগুন লেগেছে বনে বনে।  ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায় তখন পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে , আমি বলছি ধীরে বউ উতল হাওয়া।  সেকি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ প্রাণেশ হে , আনন্দ বসন্ত সমাগমে। 

কিন্তু সুন্দর চিরস্থায়ী হয় না।  খরবায়ু বেগে বইতে থাকে , আমরা দুজনে দুদিকে ছিটকে পড়ি।  তবু কষে হাল ধরে দীর্ঘদিন এই তরণী বয়ে চলি।  মাঝে মাঝে যখন হাঁফ ছেড়ে সব ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে , তখন একলা চলার গান এসে পেছনে এক লাথি মেরে বলে টুকরো করে কাছি পালে হাওয়া লাগা।  মন তখন মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিক দিগন্তের পারে।  ঝগড়ার মাঝে অসহায় পুরুষ কেঁদে উঠে বলে ভালোবাসা সেকি শুধুই যাতনাময়।  একাকিত্বের দোলায় দুলতে দুলতে সেদিন দুজনের দোলার কথা মনে আসে। 

লিখতে লিখতে রাত ভোর হয়ে যাবে , তবু শেষ হবে না একের পর এক রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব আমার জীবনে। কি বিচিত্র সেই সৃষ্টি , কি বিচিত্র শব্দের খেলা, কি বিচিত্র সুরের সমাগম।  না , ঢং করে সেই প্রাণের কবি , মনের কবি বলতে পারবো না।  কিন্তু জীবনের প্রত্যেক পদে পদে তার ছোঁয়া যে আমার গায়ে লেগে আছে , সেটার অবমাননা করি কি করে। 

যবে থেকে লেখা শুধু করলাম তবে থেকে মনে একটা ভয় থাকতো।  এই কেউ এসে না বলে যে রবীন্দ্রনাথ টুকেছি।  বাঙালির আঁতেল সম্প্রদায়ের এই এক অদ্ভুত চুলকানি। আর এতেই আমি রবীন্দ্রবিরোধী হয়ে পড়ি।  রবীন্দ্রনাথ তার আশপাশের চরিত্র নিয়ে লিখেছে , আমিও তো তাই।  তিনি বিখ্যাত আমি অখ্যাত।  যেমন পৃথিবীতে সাত জন এক রকম হতে পারে।  তাহলে তাদের চরিত্র কেন এক হতে পারে না।  আমার মতো হাজার হাজার লেখক কে গলাটিপে মেরেছে এই রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষগুলো।  যে রবীন্দ্রনাথ মুক্তচিন্তা প্রচার করে গেছেন , তারই পাঠকরা বদ্ধ হয়ে কুক্ষিগত করে রেখেছে তাদের চিন্তাগুলোকে।  কল্লোল  যুগের এই বিদ্রোহ আজও বর্তমান।

না , আমার ভালো লাগেনি চোখের বালি , না ভালো লেগেছে শেষের কবিতা।  অনেক চেষ্টা করেছি , আর এখনোও করে চলেছি।  চব্বিশ খন্ডের রবীন্দ্র রচনাবলী এখনোও আমার কাছে আছে। পরে চলেছি।  কিছু ভালো লেগেছে , কিছু না।  কিন্তু তাদের মতো আমি বলতে পারবো না কার থেকে রবীন্দ্রনাথ ভালো।  রবীন্দ্রনাথ তার নিজের থেকে ভালো - প্রতি পরের পৃষ্টায়। 

শেষ করি তার ছোটগল্প নিয়ে।  আমি দেশে বিদেশের অনেক ছোটগল্প পরেছি , আর পড়েছি সম্পূর্ণ গল্পগুচ্ছ।  নাঃ , এখানেও রবীন্দ্রনাথ এক নম্বরে নয়।  কিন্তু তার সেই বিশ্লেষনি পংক্তি , "নাহি বর্ণনার ছটা , ঘটনার ঘনঘটা , নাহি তত্ব নাহি উপদেশ , অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হয়েও হইলো না আর শেষ।" এর কোনো জুড়ি নেই।  প্রতিটি নভিস লেখক একটা কাঠামো খোঁজে শুরু করার।  তিনি সেই কাঠামো দিয়েছেন ছোটগল্পের।  ছোটোগল্পের ব্যাপ্তি তিনি যে বাঁধনে বেঁধে  দিয়ে গেছেন তার জন্য সত্যি তিনি আমার গুরু।  না কবিগুরু নন, গল্পের গুরু।    

এই হলেন আমার নাইটি পরা ইন্ডিয়ান সান্টা ক্লস যিনি আত্মসমালোচনায় প্রখর আর জগদ্দলের তীব্র নিন্দুক।  তোমরা যে যা বল ভাই , আমার পরান যাহা চাই , ইনি  তাই।  









Wednesday, August 9, 2017

আধ্যানের ডায়েরি - খেলবো না খাবো ?



পুরো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন। এলো , এসে ধরিয়ে দিলো ।  তারপর কি ? খাবো না খেলবো এটা নিয়ে।  সেটা তো আগে বল।  প্রেক্ষাপট, আমার নতুন ডে কেয়ার।  জনতা আমার মতো বেশ কিছু পাবলিক।  আর ওয়ান অ্যান্ড অনলি ভিকটিম , আমি।  এই ডে কেয়ার নিয়ে অনেক কথা বলার আছে।  কিন্তু আরো কিছুদিন থাকি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি তারপরে গুছিয়ে লেখা যাবে।  আপাতত যেটা এখন সবথেকে বড় প্রব্লেম, সেটা হলো আমার খাওয়া।  সে ডে কেয়ারেই হোক, বা পার্টিতেই হোক বা নিজের - একেবারে নিজের ঘরেতেই হোক।  সব জায়গায় আমি হেনস্থা হচ্ছি। 

কোন যে মহাপন্ডিত এসে মায়ের আর বিশেষত বাবার কানে এসে বলে দিয়ে গেছে যে ফিঙ্গার ফুড খাওয়াতে হবে , আর তাতেই দুজনে তুর্কি নাচন নাচছে, সাথে জুটেছে আমার ডেকেয়ারের দুই ডাকিনি আর যোগিনী।  মা ব্যাপারটা বেশ ভালোই সামলাচ্ছিলো।  যেহেতু আমি বাড়ন্ত বাচ্চা। হ্যাঁ,  এখানে আমি কনসিডার করছি,  আমি বাচ্চা।  শরীরের দিক থেকে তো আমি শিশু।  এনালিটিকাল এবিলিটি, কনফিডেন্স আর কমন সেন্স আমার বাকিদের থেকে বেশি হতে পারে বটে, কিন্তু আমার হাড় মাংস সবে বারো চোদ্দ কিলো।  এই পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে হলে, শুধু বুদ্ধি দিয়ে টোকা দিলে হবে না।  এম আর ভি বাড়িয়ে ধাক্কা মারতে হবে।  এইসব নিরেট পাথর কেটে বানানোর মানুষের মাথাগুলোকে টোকা দিয়ে নলেজ ঢোকানো যায় বটে, বাট টু মুভ দেয়ার বাট , আই নিড টু গিভ দেম ধাক্কাস। 

এনিওয়ে , মা আমাকে ভালোই নানা ফ্লেভারের খিচুড়ি করে খাইয়ে দিচ্ছিলো।  আমিও মন দিয়ে টিভি দেখতে দেখতে, কখনো আমার টেবিলে বসে , কখনো মায়ের কোলে শুয়ে খেয়ে নিচ্ছিলাম। আগেও বলেছি , আমার কাছে খাওয়া হলো মোস্ট আনপ্রোডাক্টিভ কাজ।  তাই খাওয়া বাদ  দিয়ে বাকি সব করতে করতে খেতে হবে , এইটা হচ্ছে ব্রিলিয়ান্ট এপ্রোচ।  মা যখন মুখের কাছে ধরে, তখন মায়ের মনে হতে পারে যে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে খাচ্ছি না।  আসলে মা কে ব্যাপারটা বুঝতে হবে যে টিভিতে তখন ভার্সাটাইল ইমোশনের এক্সপ্লোশন হচ্ছে।  যদি আমি দু চারটে ছিটেও গায়ে লাগাতে পারি তাহলে মায়েরই লাভ।  শোকেস করে ঘ্যাম খেতে কার না ভালো লাগে।  কিন্তু না , বাবার জ্ঞান আর ডে কেয়ারের ধাক্কায় মাও গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লো। হুম, এবার ফিঙ্গার ফুড দিতেই হবে। 

এই ফিঙ্গারফুড জিনিসটা প্রথমেই লিঙ্গুইস্টিকালি চটকানো।  ফিঙ্গার চিপস লম্বা লম্বা আঙুলের মতো , ফিশ ফিঙ্গারও আঙুলের মতো , ইভেন লেডিস ফিঙ্গার সবুজ আঙুলের মতো।  কিন্তু ফিঙ্গার ফুড মোটেও কোনো শেপ বা সাইজ মানে না।  ট্যারা ব্যাঁকা করে ফল পাকড় কেটে , বা চন্দ্রপুলির মতো আলু ভাজা , গোল চৌকো কুকি , এমনকি ভাতকেও এরা ফিঙ্গার ফুড বলে চালিয়ে দিচ্ছে।  ইংরেজরা সারা পৃথিবীর ঘড়িতে বারোটা বাজার সাথে সাথে কেটে পড়েছে।  যাইহোক, এই পি ইউ টি পুট আর বি ইউ টি বাট আমাকে মেনে নিতেই হলো।  কিন্তু সমস্যা বাঁধে ভ্যারাইটিতে আর ওয়ে অফ টেকিং এ। 

এ থেকে জেড , অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত খাবার, সব যেন এখন ধীরে ধীরে ফিঙ্গারফুডে পরিণত হতে থাকলো।  আর কিরকম যেন একটা কুকুর মনিব ভাব এসে গেলো বাবা মার মধ্যে।  নিজেরা খাচ্ছে।  আমি গিয়ে দাঁড়ালাম, আর দুচারটে ভাত তুলে, ‘নে টমি খা’। আমারও কি জানি কি হয় , আমিও থেবড়ে বসে ওগুলো তুলে মুখের মধ্যে ঢালার চেষ্টা করি।  ব্যাপারটা আর কিছুই না,  আমার এখন চোখের দৃষ্টি যাকে  বলে আই সাইট দিনে দিনে শার্প হয়ে যাচ্ছে।  সারা কার্পেটে পরে থাকা ছোট ছোট দানা গুলো আমার ছাড়া কার পেটে যাবে? আমি না খেলে ওগুলো হয় পচবে , নয় শুকোবে, দুটোই ওয়েস্টেজ।  তাই আমি রেস্পন্সিবল মেম্বার অফ হাউস হয়ে একটা একটা করে খুঁটে খেতে থাকি। 

কিন্তু এই ভ্যারাইটির চক্করে কোনটা এডিবল, কোনটা টক্সিক আর কোনটা পয়সন সেটা বুঝতে পারিনা।  লম্বা লম্বা বাসমতি চালের ভাত আর বাবার দাঁত দিয়ে নখ কেটে ফেলে রাখা নখ দেখতে প্রায় এক, কিন্তু ডাইজেশনে দুটো স্কেলের দুদিকে।  সর্ষে ইস গুড , কিন্তু মায়ের কানের দুল থেকে ঝড়ে পড়া কালো বিডস খতরনাক। চুল মাথায় থাকলে কোনো সমস্যা নেই কিন্তু পেটে গেলে আর রক্ষে নেই।  সবজি সবই ভালো, কিন্তু নিচে পরে থাকা খোসা নাকি ডেঞ্জারাস। আমি কি আর অতো ছাই বুঝি নাকি। হাজার তার নাম, হাজার তার রূপ।  এখন সব মিলিয়ে ভোকাবুলারি দুশো শব্দ ( বোকা বোকা সাইকোলজিস্টরা গুল দেয় , আর আমি এটাই ইউস করে নেপোয় দই মারি ) . আমার এখন শেপ , সাইজ এন্ড টেস্ট  ইম্পরট্যান্ট , হাইজিন আর এতিকেট নয়।   

কিন্তু সমস্যা আরো।  হয়তো হাইজিনিক পরিস্থিতিতে খাওয়া দেওয়া হলো, কিন্তু এটা বলে দেওয়া হলো না খাবো কি ভাবে , তখন ? আচ্ছা কয়েকটা এক্সাম্পল দিচ্ছি।  দুধ খাই চুষে , চুষলেই গলায় ঢুকে যায়, ওষুধ খাই চেটে , জল খাই মাথা উঁচু করে , মায়ের আঙ্গুল খাই কামড়ে , কিন্তু এই ফিঙ্গার ফুড খায় কি করে। আমার যতদূর জানা ছিল বড়রা এসব খায়না। ওদের খাবারগুলোকে পাম ফুড বলা চলে।  প্রথমে ঢেলে, তারপর চটকে মেখে তারপর গোল গোল করে মুখে ঢালে। আঙ্গুলগুলো পামের সাথে লেগে আছে তাই পামফুড। আচ্ছা,  তাহলে বড় হলে আমি বাবার মতো করে খাবো।  কিন্তু আমি কি বড় নই।  আমি তো মেহেরের থেকে বড় , ঐশীর থেকে বড়।  তাহলে লেটস ফলো দা বড়স, এন্ড মেক ইট বেটার। 

এই ভেবে পরের দিন ডে কেয়ারে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম লাঞ্চের। কেউ জানেনা আমি কি করতে চলেছি।  যদিও আমার বন্ধুদের বিশেষ যায় আসে না, কারণ তারা আমার থেকে একটু বেশি পাকা। এরা সব কিছু আগে থেকে শিখে এসেছে।  মনে হয় ওরা এখানে আসার আগে অন্য কোনো স্কুলে দু তিন ঘন্টা থেকে আসে।  ওরাও খায়, কিন্তু আমি ঠিক ওদের খাওয়া বুঝতে পারিনা।  চামচ দিয়ে খায়।  ফিঙ্গার ফুড খেতে দেয় , সবার হাতে দশ দশটা আঙ্গুল অথচ সবাই একটা চামচ নিয়ে খোঁচা মেরে মেরে খায়, জাস্ট ভোগাস।  এরা নাকি দেশের ভবিষ্যৎ।  অপ্টিমাইসড ইউস অফ ন্যাচারাল রিসোর্সেস না হলে কি আর দেশোদ্ধার হয়।  যাইহোক দেশের প্রেসিডেন্ট একটাই হয়। 

শেষমেশ খাওয়া এলো।  লাল, সাদা, সবুজ , গোল চৌকো , ত্যাবড়া আর থ্যাবড়া।  একবার চোখ বুঝে মা বাবার খাওয়া স্মরণ করলাম।  তারপর প্রথম কাজ হলো বাটি  উল্টে দেওয়া।  ডিসিশনে একটু লেট্ হয়ে গেলো কারণ বাটি নেই।  একটা থালার  ওপর গোল গোল খাঁজ কাটা।  ব্যাপারটা তো বাবার প্লেটে নোটিস করিনি।  যাহোক মেন্ মুদ্দা হলো , প্রথমে উল্টোতে হবে।  তাই পুরো থালাটা উল্টে দিলাম।  সমস্ত কিছু গিয়ে পড়লো টেবিলে।  কোনো প্রব্লেম নেই।  এবার কাজ হচ্ছে চটকানো।  বাবাকে আলুভাতে মাখতে দেখেছি।  প্রথমে যেটাই একটু বসে থাকবে তার ওপর তালু দিয়ে জোরে চাপ দিলে শুয়ে যাবে, এই হোলো লজিক।  আমি একটু আলাদা ভাবে তালু দিয়ে মারলাম এক থাপ্পড়।  একদম সাকসেসফুল সবুজ সেদ্ধ বিনস একনিমিশে থেঁতো হয়ে গেলো।  এরপর বাকি সব গুলো একে একে থেঁতলে তারপর চটকাতে থাকলাম।  বেশ সব কিছু মিলে মিশে এক রামধনুর সৃষ্টি হলো।  ব্রেভো আধ্যান ব্রেভো।  এরপর মাখা।  মাখা আর কিছুই নয় এদিকের জিনিস ওদিকে ঘষে ঘষে নিয়ে যাওয়া, আর তারপর সবগুলোকে মিশিয়ে দেওয়া।  আমার আর ক্লারার টেবিল জোড়া।  আমি ভাবলাম লেটস হেল্প দা পুওর লেডি।  ওর টেবিল থেকেও টেনে টেনে ঘষে ঘষে আমার টেবিলের জিনিসের সাথে মাখিয়ে দিলাম।  এবার খাওয়া। 

কিন্তু ওটা কি।  একটা গোল মতো জিনিস।  সবাই সসেজ সসেজ বলছে।  কোনো রকমে জিনিসটা হাতে তুললাম।  আমার গাড়ির চাকার মতো।  দেখতেও ওরকম কিন্তু গন্ধটা বেশ "আয় খা , আয় খা " মতো।  এটা নিয়ে কি খেলবো না খাবো।  সবাই দেখছি সেই চামচ দিয়ে খোঁচানো শুরু করেছে।  তাহলে আমাকেও খেতে হবে।  আমার কিন্তু সেই মেথডিকাল এপ্রোচ। ঢালা, থ্যাঁতলানো , চটকানো , মাখা  দেন খাওয়া। 

টেবিলে ফেললাম , মারলাম এক থাপ্পড় কিন্তু ব্যাটা শুয়ে পড়ল না, উল্টে আমার হাতটাই কিরকম নোনতা আর চকচকে হয়ে গেলো।  একটু চেটে নিয়ে দেখলাম।  বেশ খেতে, নোনতা নোনতা।  কিন্তু এটা তো থ্যাঁতলানো গেলো না , মাখব কি করে। ঠিক আছে , অনেক ভেবে বার করলাম যে এক্সেপশন বা ব্যতিক্রম তো থাকতেই পারে।  যেমন সবকটা মূর্খদের মাঝে আমি পন্ডিত। তাই আমি এবার ওটা হাতে তুলে নিলাম। এবার সোজা মুখে ঢুকিয়ে দেব।  ওয়ান - টু - থ্রি।  একি, সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে কেন?  আর আমি স্বাদ পাচ্ছি না কেন।  মা যখন খাওয়ায় বা একটু আগেই তো খেলাম, নোনতা নোনতা। কিন্তু এখন স্বাদ পাচ্ছি না কেন?  আর কানেও যেন কম শুনছি।  বাঁ হাত দিয়ে তুলেছিলাম , কিন্তু সেটা মুখে পৌঁছয়নি।  কানে গেছে।  কি লজ্জা,  কি লজ্জা। আসলে মাথাটার খেয়াল আছে , কিন্তু মাথার কোথায় মুখটা সেটা সব সময় ঠিক ঠাওর করতে পারিনা।  বাবা যখন খিচুড়ি খাওয়ায় আসলে মুখ, নাক , কান সব কিছুই ইউস করতে হয়।  তাই মাঝে মাঝে একটু আধটু গন্ডগোল হয়ে যায়।  কুচ পরোয়া নেই আধ্যান, কান টানলেই মাথা আসে।  আর মাথাতেই কান আছে।  আর কানে শুনলেই মুখে বলা যায়।  তার মানে কানের কাছাকাছি মুখ আছে।  শুধু খাবারটা টানলেই হলো। 

টানতে টানতে নিয়ে এলাম সসেজটাকে এক জায়গায়, দেখলাম সবাই থমকে দাঁড়িয়েছে।  সবার চোখ আমার দিকে।  তার মানে ওটাই মুখ।  এবার ফিঙ্গারে প্রেসার দিলেই ব্যাপারটা আলতো করে মুভ করে যাবে জিভের মধ্যে।  একটু চাপ দিলাম , কিন্তু কৈ এখনো তো কোনো স্বাদ নেই।  আরেকটু চাপ দিলাম , তাতেও কিছু হলো না।  কিন্তু এবার আবার সবাই হেসে ফাটিয়ে দিলো।  আমি লাল হয়ে গেলাম চেষ্টা করতে করতে।  বেশ কিছুক্ষন ধস্তাধস্তি করেও যখন ঢুকলো না ভেতরে , তখন জোয়ান্নার দিকে তাকাতে বুঝলাম আমি কান আর মুখের মাঝখানে যে গালটা আছে সেটাতেই ঢোকানোর চেষ্টা করছি।  লজ্জায় মাথা আরো নিচু হয়ে গেলো।  কিন্তু শুরু করা কাজ, আমায় শেষ করতেই হবে।  আবার পথ চলা শুরু।  কিন্তু মুখের কাছে আসতেই থপাস।  হাত থেকে গেলো পরে।  এবার সোজা মুখে পুরবো।  একটু হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিলাম নোংরা হয়ে যায়নি তো।  দেখলাম,  না , বেশ ঠিকই আছে।  কিন্তু সোজা মুখে পুরতে যেতেই আমার হাত চেপে ধরলো ডাকিনি যোগিনীর একজন।  লাঞ্চ টাইম শেষ।  এবার উঠে পড়তে হবে।  আমার তখন তীরে এসে তরী ডোবার মতো অবস্থা।  এতো কষ্ট করে স্টেজ তৈরী করে পা ভেঙে ফেললাম নাচার আগেই।  গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করলো , কিন্তু আবার সেই প্রেস্টিজ আমার সামনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো।  আর ওই শশী , শিবা , ক্লারা , জনি সবাই আমার দিকে তাকিয়ে খ্যা খ্যা করে হাঁসতে লাগলো।             

এই নন প্রোডাকটিভ কাজে আমাকে জোর করে ঠেলে দেওয়ার কারণ ফাঁকিবাজি।  কাজ করবো না, তাই এই মহান বাণী বেরোয় মা দের মুখ থেকে , "নিজে খেতে শেখো।" এইটুকু কাজ করতে এতো অনীহা। আর এই অনীহার জন্য আমাদের মতো ইন্টেলিজেনট শিশুদের এরকম বার বার ইন্সাল্ট হতে হয় সোসাইটির কাছে।  ওরে গাছকেও ঠেকনা দিতে হয় দাঁড়ানোর জন্য।  একটু না হয় বড় বয়স পর্যন্ত খাইয়ে দিলি।  তাতে কি গায়ে জ্বর আসে।  আর এই বাবা , এখনো তো মাঝে মাঝে আমার মা তোমাকে খাইয়ে দেয় তখন কি মা বলে "নিজে খেতে শেখো। " আমার সর্বসমক্ষে যা ইনসাল্ট হয়েছে সেটার জন্য তোমরা দায়ী।  যাইহোক ল্যাজ তো আর সোজা হবে না তাই আপাতত রাখি, আমি আর জাস্ট নিতে পারছি না।  শুধু একটাই রিকোয়েস্ট , কোনটা খাবো আর কোনটা নিয়ে খেলবো সেটা এটলিস্ট বলে দিয়ো।

আধ্যানের ডায়েরি আগের পাতাগুলো 


Sunday, July 30, 2017

আধ্যানের ডায়েরী - মাছ দেখা





দু তিন ধরে শুনছি মাছ দেখতে যাবো। এতোদিন শুনছিলাম বাঙালির ছেলে হয়ে জন্মেছিস , তো মাছ খেতেই হবে।  এখন অন্য কথা শুনছি।  মাছ দেখতে যেতে হবে।  এই বড় বড় লোকগুলো না বেশ কনফিউসিং।  কখন কি ট্রুথ হঠাৎ করে চেঞ্জ করে দেবে বোঝাই যায়না।  আমার যদিও এনালিটিক্যাল ব্রেন উইথ শার্পনেলস , তবু পুরোপুরি ব্যাপারটা প্রেডিক্ট করতে পারলাম না।  মাছ সবসময় কিনে নিয়ে এসে তারপর সেটাকে কেটে ধুয়ে , আমার খিচুড়ির মধ্যে মেখে আমাকে খাওয়ানো হয়।  আর অনেক ধরণের মাছ হয় আর সব কটার বিকট বিকট নাম।  তাই বেছে বেছে ভালো মাছ নিয়ে আসতে হয়।  ঠিক তেমনি আমরা আজকে যাবো মাছ দেখতে। যদি ভালো লাগে তাহলে আমরা কিনে এনে কেটে খেয়ে ফেলবো।  এটাই ডিল। 

কিন্তু মাছ তো সব জায়গাতেই পাওয়া যায়।  তার জন্য দু ঘন্টা ড্রাইভ করতে হবে কেন।  আমার যদিও ভালোই লাগে গাড়িতে করে ঘুরতে।  লম্বা লম্বা ড্রাইভ করতে, ব্র্যাকেটে এস এ প্যাসেঞ্জার।  আমার এখনও পেছন দিকে মুখ করা কার সিট্।  আমি লম্বা হয়ে গেছি, পা টা পুরো ধরে না।  কিন্তু তাও বাবা নতুন ফ্রন্ট ফেসিং কার সিট্ লাগাবে না।  কি না রুল নেই।  আরে বাবা রুল তো ওপেনলি ঢেকুর তোলারও নেই।  ইট কনসিডার এস ব্যাড ম্যানার্স।  কিন্তু কমফোর্টের জন্য তো ঢেকুর তুলতেই হবে।  আমার যে এই পা আটকে যাচ্ছে , আর সেটা চূড়ান্ত ডিসকমফোর্টের সৃষ্টি করছে সেটা কি কেউ বুঝছে।  নাকি মাইনরে কমফোর্টের কোনো অধিকার নেই। 

এই নিয়ে চর্চা অন্য একদিন হবে।  আপাতত যেমন ভাবেই বসি না কেন গাড়ি চললে যে দুলুনি লাগে সেটা প্রাইসলেস।  আমি পেছনের দিকে মুখ করে বসে থাকি আর কাছের মধ্যে দিয়ে কত গাছ হেটে চলে বেরিয়ে যায়।  আমার সাথে কথা বলার মতো সময় তাদের খুব কম।  একমাত্র যখন গাড়ি দাঁড়িয়ে যায় তখন তারা আমার সাথে কথা বলে।  যদিও বেশির ভাগ সময় একটা তিনচোখ জন্তু আমার দিকে তাকিয়ে দুলতে থাকে।  তিনটে চোখ তিন রঙের।  সবুজ, লাল আর হলুদ।  সব চোখ এক সাথে জ্বলে না।  যে সবুজ চোখ খোলে তখন দেখি গারো চলতে আরম্ভ করেছে আর সব গাছ গুলো ছুটছে। 

আমি কিন্তু কখনো গাছেদের ছুটতে দেখিনি - গাড়ির ভেতর থেকে ছাড়া।  আমার ঘরের জানলা থেকে একটা গাছ দেখা যায়।  আমি যখন ছোট ছিলাম। তখন দেখেছি গাছের পাতা গুলো ওই তিনচোখ জন্তুটার মতো রং পাল্টায়।  আর একবার দেখেছিলাম সব পাতা নিচে  পরে গেছিলো।  সে অনেকদিন পর আবার পাতা এসেছিলো গাছে।  এখন সবুজ তকতকে পাতা।  গাড়ি থেকে নেমে অনেকবার বাড়ি গিয়ে ওই গাছটাকে বলেছি একটু ঘুরে আসতে।  কিন্তু ওটা একটা বুদ্ধু গাছ।  মনে হয় বুড়ো হয়ে গেছে।  নড়তে চড়তে পারে না।  কিন্তু মিনিমাম কার্টেসি পর্যন্ত নেই যে আমার কথার উত্তর দেবে।  কথাও বলে না।  হাঁদার মতো হাত পা তুলে বসে থাকে। 

উফফ এই অভ্যেস আমার দিনে দিনে খারাপ হয়ে যাচ্ছে।  টু দি পয়েন্ট , কারেক্ট এন্ড এফেকটিভ স্টেটমেন্ট লিখে যৎকিঞ্চিৎ শ্রমের বিনিময়ে উৎকৃষ্ট লেখার থেকে আমি শুধু ডাইভার্টেড হয়ে এক্সপ্লেনের পর এক্সপ্লেন করে চলেছি।  হচ্ছিলো কথা মাছের আর চলে গেলাম গাছে। গাছ আর মাছ যদিও বেশ মিল আছে কিন্তু তা বলে কি মাছ গাছে থাকে ? তাই তো ? মাছ কোথায় থাকে সেটাই তো জানিনা।  গাছে তো পাখি থাকে দেখেছি।  উড়ে এসে জুড়ে বসে।  কিন্ত মাছ? ইনকিউসিটিভ চোখ নিয়ে মা কে প্রশ্ন করলাম আর মা বোকার মতো তাকিয়ে হাসলো।  এখনো আমার আর মায়ের মধ্যে সেই পেনফুল ল্যাঙ্গুয়েজ গ্যাপ। 

মাছ যেখানেই থাকুক আমার জার্নিটা বেশ মজাদার হলো।  একবার মা , একবার দাদু আমার পাশে বসে আমার সাথে সারা রাস্তাটা গেলো।  আমি যদিও মাঝে বেশ কিছুটা সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।  ওই দোল দোল দুলুনিতে কি আর কেউ জেগে থাকতে পারে।  ঘুমটা যখন ভাঙলো তখন দেখি আমার চার পাশে বিশাল বড় বড় বাড়ির মতো কিছু একটা।  না গাড়ি না বাড়ি।  সামনেরটা তিন কোনার মতো।  বিশাল বিশাল আকার।  বাবা দেখি আবার আমার হাত ধরে টানতে টানতে সেগুলোর মধ্যেই একটাতে নিয়ে যাচ্ছে। সেটা আবার জলে ভাসছে।  বাবা আমায় কোলে তুলে নিতে দেখি সামনে অনেক জল।  তাতে এইরকম অনেকগুলো ভাসছে।  আমরা ওটার মধ্যেই উঠে গেলাম।

ওটার ভেতরে আবার ঘরের মতো।  আমার ঘরে যেরকম টেবিল আছে , সেরকম অনেক টেবিল পাতা।  আমরা একটা বড় একটা টেবিল জুড়ে বসে পড়লাম।  আর মা শুরু করে দিলো অত্যাচার।  ঘুম থেকে উঠলেই নাক টিপে খাওয়ানোটা মায়ের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।  এখানে এতো লোকের মাঝে সেই গেলানোর চেষ্টা চলতে লাগলো।  কোথায় আমি চারপাশ দেখবো, ফীল করবো তা নয়, আমাকে খিচুড়ি খেতে হবে।  মা ও নাছোড়বান্দা। দেখলাম বেগতিক , মা ছাড়বে না।  আমি মোটামুটি আধ বাতি খেয়ে নিলে তবে মা ঠান্ডা। 

ততক্ষনে দেখি গাড়ির মতো এটাও চলতে আরম্ভ করেছে আর সবাই এটাকে বোট বলছে।  বোট চলছে জলের উপর দিয়ে।  সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আর আমরা বোটের ভিতর ঘরে।  বাবার এই আনসোশাল বিহেভিয়ার পছন্দ হলো না।  আমাকে কোলে তুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো।  কি সুন্দর হাওয়া বাইরে।  কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যে টের পেলাম কি ঠান্ডা আর কি জোরে হাওয়া দিচ্ছে।  এই ভরা গরমে আমার দান্তে দাঁত লেগে যাওয়ার জোগাড়।  চোখ মেলে তাকাতে পারছি না হাওয়ার দিকে।  মা এসে কি একটা যেন পরিয়ে দিতে কানে ঠান্ডা লাগাটা অনেক কমে গেলো।  কি আরাম।  কিন্তু মোটেই ভালো লাগলো না যখন সবাই আমাকে ছোট্ট ব্লু হনুমান বলতে আরম্ভ করলো।

সে যা হোক।  অনেক্ষন আমি বাবা মা আর দাদু বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।  ধীরে ধীরে সবাই একে  একে  ভেতরে চলে এলাম।  ভেতরে আসতে আমার সাংঘাতিক ঘুম পেয়ে গেলো।  এই বোট গাড়িটা বাবার গাড়ির থেকেও বেশি দোলে আর ঝিম আসে।  আমি ধীরে ধীরে ঘুমে ঢলে পড়লাম।

ঘুম থেকে উঠে দেখি সবাই বোটের এক দিক থেকে আরেক দিকে দৌড়াদৌড়ি করছে।  আর আমি একা আমার স্ট্রলারে শুয়ে আছি।  গলা ছেড়ে কাঁদতে যাবো , দেখি বাবা সোজা কোলে তুলে নিয়ে বাইরে নিয়ে চলে এলো।  কি সাংঘাতিক রোদ বাইরে সাথে হু হু করে হাওয়া।  আমি অনেক ছোটবেলা সমুদ্রে গেছিলাম।  তখনও চোখ খুলতে পারিনি , এখনোও চোখ খুলতে পারছিলাম না।  নীল সমুদ্র , হু হু হাওয়া , আর বাবা জোর করে
আমায় কিছু একটা দেখানোর চেষ্টা করতে লাগলো। আমি একবার মাথা ঘুরিয়ে দেখারও চেষ্টা করলাম।  আফটারঅল বাবা তো।  নিশ্চই কিছু দেখানোর চেষ্টা করছে হুইচ মে বি ইন্টারেস্টিং।  কিন্তু যেদিকে তাকাই , শুধুই তো জল।  আর আমাদের বোটের মতো আরো কিছু কিছু বোট। 

আমার পেছন থেকে সামনে থেকে লোকে কেন যে এতো ঝাপাঝাপি করছে কেন তা বুঝতে পারছি না।  বোটটা এবার একেবারে শান্ত হয়ে গেলো।  সবাই চুপচাপ।  সবাই ক্যামেরা তাকে করে আছে জলের দিকে।  হঠাৎ করে , বিশাল শব্দ করে একটা কি একটা বিশাল মতো জিনিস জল থেকে  লাফিয়ে উঠে ঝপাস করে আবার জলের ভেতর ঢুকে গেলো। 

কি ওটা ? হোয়াট ইস দ্যাট? আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। ওটাও কি আমাদের বোটের মতো বোট।  জলের তলায় ঢুকে যায় ? কি জানি।  সবাই এতো আনন্দ করছে কেন।  সবাই বিশাল খুশি।  বাবাও দেখি সাংঘাতিক খুশি।  আবার সবাই ক্যামেরা তাকে করে বসে আছে জলের দিকে।  কিন্তু অনেকক্ষন কিছু হলো না।  শেষে একটা বেশ কিছু তোলপাড় হয়ে একটা কিছু জিনিস হালকা ভাবে জলের ওপর ওঠে নেমে গেলো।  আর সবাই চিৎকার করে উঠলো ওই তো ওই তো হোয়েল।  মানে তিমি মাছ। 


আমার গেলো মাথা গরম হয়ে।  আমরা আবার ফিরে এলাম আমাদের গাড়ির কাছে।  অনেক্ষন পরে।  আমি ততক্ষনে এই বড় বড় আহাম্মকদের প্রচুর মুণ্ডুপাত করেছি।  এ কি পয়সা নষ্ট।  এই এতটা নিয়ে গিয়ে মাছ পর্যন্ত খেলাম না।  শুধু খিদে বাড়িয়ে নিয়ে চলে এলাম। ওই অতো বড় মাছটা শুধু দেখতে কেউ যায় ? আর তাও এতো দূরে , এতো কষ্ট করে।  বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার মধ্যে তো অনেক সময় চলে গেলো আর মাছ দেখলাম তো পাঁচমিনিট।  এই ঢঙের ঠিক কি মানে আছে বলতে পারো।  আর দেখা দিয়ে কি হয়।  দেখে কি আনন্দ।  সঙ্গে করে নিয়ে এলে আমি একটু খেলতে পারতাম।  কিন্তু না , বাবা হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখলো।  আর আমার চোখ ঝালাপালা করে দিলো।  একবারও চেষ্টা করলো না ওটাকে আমার জন্যে নিয়ে আসার।  যাকগে বয়স বাড়লে আপনিই বুঝতে পারবে কি ভুল আজকে করেছিল।  বাবাটা বড্ডো ইমম্যাচিউর। যাইহোক , শুধু লাস্টের চার লাইনের ফ্রাস্ট্রেশন লেখার জন্য আমিও অনেক ভনিতা করেছি বলে দুঃখিত।  কিন্তু আমি কেন একা ভুগবো , সবাইকে নিয়ে ডুববো। আজ আমার হোয়েল ওয়াচিং এর এখানেই ইতি।         

আধ্যানের ডায়েরি আগের পাতাগুলো 


Tuesday, July 25, 2017

আধ্যানের ডায়েরী - বাবা এলো শেষমেষ


সকালটা একটু অন্য ধরণের ছিল।  সকাল বেলা ইউসুআলি আড়মুড়ি খেতে খেতে মায়ের চটকানি খাই।  কিন্তু আজ যখন ঘুম ভাঙলো, দেখি মা নেই পাশে।  দাদু শুয়ে শুয়ে নাক ডাকছে।  এই নাক ডাকা নাকি শুধু অন্যদের দেখা যায়, নিজেরটা বোঝা যায় না কিছুতেই।  মা একবার আমার ভিডিও তুলে বাবাকে পাঠিয়েছিল।  আর দুজনেই হ্যা হ্যা করে হায়েনার মতো হাসি হাসছিলো।  এটা তো সবাই করে , তাতে হাসির কি হলো শুনি।  আমি মায়ের নাক ডাকা শুনেছি, দাদুর নাক ডাকা শুনেছি , বাবার নাক ডাকা এখনো শোনা হয়নি।  বাবা তো আমার কাছে ছিলই না।  এই গোটা এক বছর একা একাই কাউকে কিছু না দেখিয়ে চুপি চুপি নাক ডেকেছে।  আর কেউ হাসেনি বাবার ওপর। 

আমি দাদুকে ঠ্যালা দিয়ে উঠিয়ে দিতে, দাদু ধড়মড়িয়ে উঠে বসে পড়লো।  দাদুর প্রচুর কর্তব্য কর্মের ওপর নজর।  আমার জন্য ভালোই।  আমার সাথেই সারা দিন থাকে।  দাদু না থাকলে তো আই আম দা অনলি মেল পার্সন ইন দা হাউস।  সেই কর্তব্যকর্ম থেকে দাদু আমায় বিরতি দিয়েছে।  দাদুর সব ভালো লাগে, কিন্তু ডাইপার চেঞ্জ করার সময় এতো জোরে পা টা তুলে দেয়  নাইন্টি ডিগ্রিতে , সেটা প্রায় অসহ্যর লেভেলে। বাকি সবই ঠিক আছে। 

সকালে আমার সমস্ত কাজ এক এক করে সেরে আমি তখন খেলছি।  সব কাজ বলতে , ডাইপার চেঞ্জ করা আর খাওয়া।  রাতের আঁধারে আমার ডাইপার থলেতে রূপান্তরিত হয়।  আমার ডিসপেন্সেবল এন্ড নন কনভিনিয়েন্ট পোর্টেবল টয়লেট।  হ্যা , নন কনভিনিয়েন্ট।  আগেও লিখেছি , আবারো বলছি আর ভবিষ্যতে আবার এই ডাইপারের ঝামেলা নিয়ে লিখবো।  ইট ইস জাস্ট আনাদার ইউসলেস ইনভেনশন।  কিন্তু যেহেতু আমার হাতে শক্তি আর মুখে বুলি দুটোই নেই তাই 'যথা আজ্ঞা' বলে সব কিছু মাথা পেতে নিয়েছি।  আর আমার ঠ্যাং তুলে সবাই মিলে অত্যাচার কন্টিনিউইং।

যাই হোক , আমার সব কিছু হয়ে গেলে আমি বসে বসে হালুমের সেকেন্ড ঠ্যাংটা বানানোর চেষ্টা করছিলাম। কয়েকদিন আগেই ভেঙে দিয়েছি , আজ ভাবলাম জোড়ার চেষ্টা করি।  হঠাৎ দেখি দরজা খুলে গেলো।  আর একটা বিশাল লোক ঢুকলো ঘরে।  আর পেছনে পেছনে মা , হাতে মোবাইল আমার দিকে তাক করা ।  বেশ ঝকঝকে দেখতে লোকটা।  সুন্দর জামা কাপড় পরে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ নিয়ে এগিয়ে এলো।  একদম বাবার মতো দেখতে।  কিন্তু বাবা তো মোবাইলের মধ্যে থাকে।  আমার থেকেও ছোটো।  আমার সাথে কথা বললে মুখ গোল করে একটা অদ্ভুত আওয়াজ বার করে।  আর তাতে আমার বেজায় হাসি পেয়ে যায়।  বেশ মজাদার শব্দটা।  কিন্তু এটা কে।  বাবার নকল? এখানে অনেকেই আসে।  সাগ্নিক কাকু আসে , অর্ণব কাকু , ভাস্কর কাকু , সবাই অনেক বড় বড়।  বাবার মতো বেশ ছোট্ট খাটো হাতে ধরা যায় এরকম নয়।  কিন্তু সবাই আসে কাকিমার সাথে।  কিন্তু এ আবার কে , যে মা সঙ্গে করে নিয়ে এলো। 

সাথে আবার মা মোবাইল ধরে আছে যে ভাবে তাতে ব্যাপারটা বোঝাই যাচ্ছে যে ক্যাপচারিং দা মোমেন্ট।  কি এমন গুড় আছে এই কালো লোকটার গায়ে।  বাবার মতো দেখতে বটে , কিন্তু বাবা তো অনেক ফর্সা।  এ তো দেখছি কালো।  আর এ তো পাহাড়ের মতো বড়।  লম্বা চওড়া ওই টিভিটার মতো।  আমি তো এক হাত দিয়ে ধরতেই পারবো না।  আমি একেবারে থতমত খেয়ে গেলাম।  একবার লোকটার দিকে তাকাচ্ছি , একবার মায়ের দিকে।  একটাই শান্তি , মায়ের মুখে একটা বিশাল শান্তির হাসি।  কি সুন্দর লাগছে মা কে।  তাহলে এই লোকটা কি সত্যি সত্যি আমার বাবা?

যদি বাবা হয় তাহলে আমার এখন ঠিক কি করণীয়।  হাসবো , আনন্দে লাফাবো না অভিমান করে দুঃখে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদবো।  যদি বাবা হয় তাহলে তার ওপর রাগ করাটা আমার কাছে স্বাভাবিক।  সবার বাবা সবার সাথে থাকে আর আমি শুধু একা , একা পরে আছি এখানে।  তার ওপর আমার জন্মদিনে, আমার ফার্স্ট জন্মদিনেও এলো না।  আমি বাবার ওপর রাগ করে আমার ডাইরি লেখা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলাম।  আই হ্যাভ টু শো দা ওশেন অফ অ্যাংরি সরো টু হিম।  কিন্তু যদি এটা বাবা না হয়ে অন্য কেউ হয় তাহলে তো নাম ডুবে যাবে।  ঘ্যান ঘ্যানে ছেলে হিসেবে মার্কেটে প্রজেক্টেড হবে।  আর যদি মা এই লোকটাকে বাবার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে নিয়ে আসে , হুইচ আই সাপোর্ট সিইং হিস্ ডিডস, তাহলে তো পুরো কেলো।  ফার্স্ট ইম্প্রেশন ইস লাস্ট ইম্প্রেশন। 

ভাবতে ভাবতে মুখ থেকে একটা ক্যাবলা ক্যাবলা হাসি বেরোতে না বেরোতে লোকটা আমায় কোলে তুলে নিলো।  কি অদ্ভুত এক সুন্দর অনুভূতি।  কি ভালো লাগলো।  আগেও অনেকে আমায় কোলে নিয়েছে।  কত কাকু আমার সাথে কত খেলা করেছে।  কিন্তু এ যেন একদম অন্য রকম।  এই লোকটার থেকেও অনেক শক্তিশালী লোক আমায় কোলে তুলেছে।  কিন্তু এর মতো শান্তি শালী কেউ না।  সবাই কেমন যেন ভয়ে ভয়ে আমায় কোলে নেয়।  এর যেন কোনো ভয় নেই।  যেন আমি লোকটার নিজের শরীরের একটা পার্ট।  আমার এই হাতটার মতো , যেমন আমি যখন ইচ্ছা তুলি আর নামাই, লোকটা যেন ঠিক সেই ভাবে আমায় নিয়ে খেলা করতে লাগলো।   

আমার তখন খুবই কনফিউসিং অবস্থা।  কি করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।  শেষমেশ আমার সেফ কর্নার মায়ের দিকেই হাত বাড়ালাম।  মা তখন আমায় কোলে নিয়ে নিলো।  মা কোলে নিতেই বুঝতে পারলাম মা কি খুশি।  মায়ের সারা শরীর তখন কাঁপছে আনন্দে, আর মায়ের হাসি একদম অন্য।  তাহলে কি মা চাইছে যে আমি ওই লোকটার সাথেই খেলা করি।  এই লোকটা মায়ের যতটা কাছে আসছে ততটা কিন্তু কাউকে আসতে দেখিনি।  এমনকি দাদুকেও না।  মায়ের কোলে থাকতে থাকতে দেখি লোকটা আবার হাত বাড়াচ্ছে আমার দিকে।  তখন মা বলে উঠল , "যা , বাবা তো। "

আর কোনো সন্দেহ নেই।  এই লোকটাই বাবা।  মোবাইলের ছোট্ট ঘরে ছিল।  এখন বড় হয়ে গেছে।  মা কখনো মিথ্যে বলবে না আমায়।  এটাই বাবা।  এ-টা-ই সেই বাবা।  আমি সেই চোখ খুলে এটাকেই দেখেছিলাম। ঠিক তো।  তখন তো বাবা এতই বড় ছিল।  কি কষ্ট করে ওই মোবাইলের ছোট্ট ঘরে ঢুকে বসে ছিল।  এটাই তো।  আমার সব রাগ গলে জল হয়ে গেলো।  সবার মতো আমারও বাবা আছে।  এখানে , আমার কাছে।  আমার বাবা।  মাইন্ ওনলি। শুধু আমার।  আর কারো না।  কেউ চাইলেও দেব না।  এতদিন পাইনি।  আর ছাড়বো না।  এবার আমি আর বাবা, বাবা আর আমি।  শুধু আমরা দুজনে।  না , দুজনে না।  আমি , বাবা আর মা।  তিনজনে। 

বাবা দেখি আবার মোবাইল খুলছে।  নানা আর ওই ছোটো ঘরে যেতে হবে না।  আমাদের এখানে অনেক বড় বাড়ি। এখানেই থাকো।  এখানেই আমরা হালুম আপ্পু নিয়ে খেলবো।  তারপর গাড়ি করে ঘুরতে যাবো।  ও আচ্ছা।  মোবাইলে দেখি ঠাম্মার মুখ।  ঠাম্মা এখনো ওই ছোট্ট ঘরে থাকে।  তাহলে এটাই সেই বাবা। বাবা আমায় আর মা কে ধরে তিনজনকে দেখাতে লাগলো ঠাম্মা কে।  ওই তো দাদু।  শেষমেশ তাহলে বাবা আমার কাছে চলে এসেছে।  সবাই খুশি খুশি।  কি আনন্দ। 

আমার তখন ভীষণ মজা।  প্লাস , বাবা একটা অদ্ভুত জিনিস করলো।  আমাকে কাঁধে তুলে নিলো।  কি মজা।  বাবা আমার গাড়ি।  প্রথমে আমার বসতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিলো।  এরকম ভাবে তো কখনো কারোর ঘাড়ে চাপিনি।  আর ঘাড়ে চাপলে, কেমন ভাবে বসলে ঠিক হবে সেটাও জানিনা।  শুধু দেখেছিলাম অন্যদের, তাদের বাবাদের ঘাড়ে চাপতে। এখন আমারও বাবা আছে , আমিও চাপবো।  ব্যাপারটা অদ্ভুত তবে আমার কার সিটের থেকে ভালো।  ও মা , এ কি করতে আরম্ভ করলো বাবা।  একবার সামনে পরে যাবো , পরে যাবো ভাব।  আবার উঠে যাচ্ছি।  বেশ দুলুনি খাচ্ছি।  কিন্ত হেব্বি ভয় করছে।  আমি নেমে যাওয়ার চেষ্টা  করতে বাবা দেখি নামিয়েও দিলো।  বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা যে আমার ভয় লাগছে। 

এরপর তো সারাদিন শুধু মাঝে মাঝেই এসে আমায় চটকে যাচ্ছে।  আর মা কে বার বার বলছে , “একটু চেটে  নি এটাকে” . আর মা এক ধমক দিয়ে আটকে দিচ্ছে।  আমি কি ললিপপ নাকি। আমার দুপুরের ন্যাপের সময় রোজকারের মতো খালি খালি নয়।  আজ বাবা আমাকে জাপ্টে ধরে শুয়েছিল।  আমিও দিব্যি পোঁদ উল্টে ঘুমিয়ে নিলাম অনেকক্ষন।  বেশ আরাম। 


আমি ভেবেছিলাম আর আমার ডায়েরি লিখবো না।  বাবার ওপর প্রচন্ড অভিমান হয়েছিল।  কিন্তু এখন যখন বাবা চলে এসেছে আমার কাছে, তখন তো জীবন সাংঘাতিক রঙিন।  সবার মতো তো আর বাবা ভীতু নয়।  এখন থেকে আমার লাইফ ইস ফুল অফ এডভেঞ্চার।  অনেক ঘটনা, অনেক খেলা অনেক কিছু আমার লাইফে এক এক করে ঘটতে থাকবে।  অনেক কিছু শিখতে থাকবো আর ভুল করলে বাবা আর মা সেই ভুল ঠিক করে দেবে।  এন্ড দ্যাটস নিড টু বি রিটেন এন্ড প্রিসার্ভ সামহোয়ার টু শো ইট টু দা নেক্সট জেনেরেশন। তাহলে আর কি, আমার ডায়েরির সিসন টু চালু হলো।   

             আধ্যানের ডায়েরি সিসন ওয়ানের পাতাগুলো 

Saturday, June 24, 2017

প্লেন ছাড়ার ঠিক আগে




না না সব ঠিক হয়ে যাবে।  উচ্চতা তো ভালো।  খারাপ কিসের। আজ ম্যায় উপর , আসমা নীচে।  কানের কাছে ফুরফুরে হাওয়া হয়তো দেবে না কিন্তু তাতে কি?  ওপর থেকে তো নীল পৃথিবী দেখা যাবে।  কি ভালো লাগতো যখন তিরিশ তলা বিল্ডিং এর ছাদ থেকে নীচে দেখতাম। মানুষগুলো , জন্তু জানোয়ার গুলো সব ছোটো ছোটো গেঁড়ি গুগলির মতো দেখতে লাগতো।  আজ তবে কেন এতো ভয় করছে?  ভয় করার তো কোনো কারণ নেই।  আমি তো যাচ্ছি প্লেনে।   বহু বছর ধরে পরীক্ষিত এক যন্ত্র।  আমার আগে অনেকে তো মরেছে টেস্টিং এ।  আর একটু আগেই তো বলে গেছে যে এমার্জেন্সিতে যদি প্লেন ল্যান্ড করতে হয় তাহলে জলে ল্যান্ড করবে।  আর তারজন্যেই তো লাইফ জ্যাকেট দিয়েছে।  মালয়েশিয়ার প্লেনটা তো সমুদ্রেই আছড়ে পড়েছিল।  না না ওটা তো মাঝ সমুদ্রে।  আমার ক্ষেত্রে হয়তো অন্যথা হবে।  হাডসন রিভারেও তো প্লেন নেমেছিল। আর আমি তো সাঁতার জানি, গঙ্গাও পারাপার করেছি ।  জ্যাক ও তো জানতো।  কিন্তু মরলো তো রোসের জন্য।  না , না পাশে বসা মেয়েটার সাথে কিছুতেই ভাব জমানো যাবে না।  নিজে বাঁচুন তারপর অপরকে বাঁচার সুযোগ করে দিন। এই তো বলে গেলো, আগে নিজে অক্সিজেন মাস্ক পড়ুন তারপর অপরকে সাহায্য করুন। হসপিটালে যারাই মরে , তাদের আগে অক্সিজেন মাস্ক পড়তেই হয়।  তাহলে কি এরা যেটা বলে যে বায়ুর চাপের এদিক ওদিক হলেই অক্সিজেন মাস্ক আপনা থেকে বেরিয়ে আসবে , সেটা আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাস।  না না এতো তাড়াতাড়ি মরলে তো  চলবে না।  পিথাগোরাসের ত্রিভুজের দুই কোনে আমি ভূত ও ভবিষ্যৎ দুই ছেড়ে উপরে উঠেছি।  কর্তব্য ও স্বার্থ দুটোরই ব্যবস্থা করতে হয় জীবনে।  ইন্সুরেন্স টাকা নেওয়ার জন্য বসে আছে টাকা দেওয়ার বেলায় হাজার নাটক করে।  মা কে নোমিনি করা আছে সব জায়গায়।  ছেলে গেলে  মা নোমিনির টাকা নিয়ে কি করবে।  বৌ বাচ্চার কি হবে। যদিও বৌ এর চাকরি আছে।  কিন্তু তাহলেও , যদি আমিই না থাকি তাহলে জীবন কি।  যদিও দ্বিতীয়বার বিয়ে সে করতে পারে।  কিন্তু বাচ্চাটার  সব কিছু গুবলেট পাকিয়ে যাবে।  সব ডকুমেন্টেশন ঠিক ঠাক করা আছে যদিও।  সব ইউসারনেম আর পাসওয়ার্ড একটা ফাইলে স্টোর আছে।  ফাইলটা যদিও পাঠিয়ে দিয়েছি বৌয়ের কাছে ইমেলে।  ও ঠিক বার করে নেবে টাকা পয়সা কোথায় কি আছে। পারবে কি? আমার মরে যাওয়ার পর যদি আমার একাউন্ট ও এক্সেস করে তাহলে সেটা তো ক্রাইম হয়ে যাবে।  না না , স্পাউস তো মরে যাওয়ার পর বেটার হাফ, আর তার আগে বিটার হাফ।  কি সব চিন্তা করছি।  পঁচাশি শতাংশ তো করেই রেখেছি।  নতুন মিউচুয়াল ফান্ড শুধু ওই ফাইলে আপডেট করা নেই। বাকি ও বার করে নেবে।  আর বার বার মরে যাওয়ার কথাই বা চিন্তা করছি কেন, হাত পা ভেঙে পঙ্গু হয়েও তো পরে থাকতে পারি। কত সৈনিকের ঘটনা আছে।  আর এরা তো আবার প্যারাসুটও দেয় না।  শুধু নানা মিষ্টি আস্বস্তি ছড়ায়।  এই তো সেদিন পড়লাম, প্লেনে দুটো ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও তেইশ হাজার ফুট থেকে শুধু হাওয়ায় ভাসিয়ে প্লেনকে  গ্রাউন্ডে ল্যান্ড করানো যায়।  কিন্তু তার জন্য দক্ষ পাইলট লাগে।  বেসরকারি সিস্টেমে কি ভরসা করা যায়?  কি ভাবে যে তাদের ট্রেন করা হয়েছে কে জানে।  আমরাও তো ফ্রেশার দের দাঁড় করিয়ে দি ক্রিটিকাল এপ্লিকেশন হ্যান্ডেল করতে।  ফেল করলে ইয়ে , মানে , হচ্ছে , আমতা আমতা করে কাটিয়ে দি।  ফেল করলে ব্যাক আপ তো আছে।  আমার জীবনের ব্যাকআপ কি ? এই আছি , হঠাৎ করে পেছন থেকে যম এসে ধপ্পা করলেই ফুড়ুৎ।  নো ব্যাকআপ।  পাইলটের গলা তো শুনলাম। 
একবার দেখে আসলে হতো না।  আমার থেকে বয়স কি বেশি হবে? কিন্তু বয়স বাড়লেই তো অভিজ্ঞতা বাড়ে না।  অনেক বুড়োও গবেট হয়।  লার্নিং দু প্রকারে হয় - অবসারভেশন আর আবসর্প্শন।  মানে দেখে শেখা আর থেকে ঠেকে শেখা।  যদি কো  পাইলট কে অন জব ট্রেনিং দিতে গিয়ে পাইলট এর ইচ্ছা করে কোনো একটা এরর জেনারেট করে সেটা অন স্পট সল্ভ করে দেখানোর। আর যদি ঠিক করার সময় ফেল করে তবে? কি চাপ।  না একবার দেখে আসলে ভালো হয় কে চালাচ্ছে। যাবোই বা কি করে।  এখুনি সুন্দরী এয়ারহোস্টেসগুলো ক্যানাইন বার করে ঝাঁপিয়ে  পরে বসিয়ে দেবে।  এতক্ষন ধরে গলা ফাটাচ্ছিলো ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস বন্ধ করুন করে করে।  কিন্তু পাশের মেয়েটি তো দিব্যি ফেসবুক করে চলেছে।  ওই তো, আজ ম্যায় উপর লিখে ডাকফেসে ছবি দিচ্ছে।  রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির সত্যি যদি কোনো কনফ্লিক্ট হয়।  এতো বড় যন্ত্রের রেডিও সিগনালে কি এই মোবাইল সিগন্যাল কিছু করতে পারবে।  কি জানি।  বিজ্ঞানে তো আটকে যাচ্ছে।  কিন্তু সাবধানের মার নেই।  আবার সুন্দরীদের বলেও কোনো লাভ নেই।  এর এই ছোট্ট ডিভাইস যদি কিছু গন্ডগোল করে তাহলে পাইলটের স্কিলের ওপর পুরো ভরসা করতে হবে।  কিন্তু যদি পাইলটের হঠাৎ হার্ট এটাক হয়।  তাহলে তো কো  পাইলট আছে।  কিন্তু যদি তারও এক সাথে হয়।  এটাও তো হতে পারে যে ,যেহেতু পাইলট দারুন আর তাই কো পাইলট কেয়ারলেস হয়ে ফ্রি মিনিয়েচার ভদকা দশ পেগ মেরে উল্টে পরে আছে আর ঠিক সেই সময় পাইলটের হার্ট এটাক হলো। উফ কেন যে উঠতে গেলাম।  সারা পৃথিবী কেন ট্রেনে করে ঘোরা যায়না।  আমেরিকা শালা সবার থেকে আলাদা হয়ে বসে আছে।  একদিকে প্যাসিফিক আরেকদিকে আটলান্টিক।  না না কোনো ভয় নেই।  ডর কে আগে জিৎ হ্যায়। ভয় কে আটকানোর জন্য সবাই বলে ভয়ের কারণ অন্বেষণ করে কি করে তা সমাধান করা যায় সেটা জানতে হয়। এই এঙ্গেল এ চিন্তা করলে প্রথমে আমাকে প্লেন চালাতে শিখতে হবে।  চার পাঁচ পেগের পর যদিও যে কেউ প্লেন চালাতে পারে, কিন্তু সেরকম নয়।  আরেক পদ্ধতি হলো ভয় যেসব জায়গা থেকে ঢোকে সেগুলো আটকে দেওয়া, মানে ভয় যেহেতু একটা সেন্স , তাই ইন্দ্রিয় গুলোকে ঢেকে দিলেই সব শান্তি।  সেটাও করেছি, পুরোটা পারিনি কিন্তু অনেকটা করেছি।  কানে ইয়ারফোন না, ইয়ারবাড্স গুঁজে মেটালিকা চালিয়েছি , নাকের ঠিক নিচে আতর লাগিয়েছি , মুখে চুইংগাম চেবাতে চেবাতে গেম খেলছি এমনকি উইন্ডো সিট পর্যন্ত নিই নি।  আইল সিট্।  তবু পেটে একবার খেজুরের একবার আঁখের গুড়।  সবাই বলে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে কম ঝাঁকুনি হয় কারণ অনেক উঁচু দিয়ে চলে , তার ওপর আবার বোয়িং হলে কথাই নেই।  যত ভারী প্লেন তত নাকি ঝাঁকুনি কম। ঝাঁকুনি হোক কিন্ত এয়ার পকেটে যেন না পরে।  পড়লেই অনেক উঁচু থেকে ধপাস করে পড়বে শুনেছি।  যদি তখন আমি দাঁড়িয়ে থাকি।  সিট বেল্ট বাঁধা না থাকে।  আগে থেকে তো এয়ারপকেট ধরা যায় না।  বা যদি আমি তখন বাথরুমে থাকি। ধড়াম করে শূন্যে উঠে মাথা ঠুকে গেলো, মাথা চেপে বেরোতে যাবো হঠাৎ করে বাথরুম আটকে গেলো।  আমি তো ক্লস্ট্রোফোবিক।  সাথে আক্রফোবিয়া তো আছেই।  কি হবে আমার।  আর সাথে যদি দু একটা টেরোরিস্ট ওঠে তাহলে সিক্সটিন বানানা কমপ্লিট।  আমার একেতেই ঘন ঘন মুত পায় জল বেশি খাওয়ার জন্য।  টেরোরিস্টদের  এই একটা খুব বাজে জিনিস।  বাথরুম করতে যেতে দেয় না।  আর এক দেশ থেকে আরেক দেশে ল্যান্ড করায়।  লেটেস্ট জেনারেল নলেজ ফলো করা বন্ধ করে দিয়েছি।  কোনো হোমরা চোমরা টেরোরিস্ট কি তিহার জেলে আছে ? যাকে ছাড়ানোর জন্য প্লেন হাইজ্যাক করতে হবে।  কিচ্ছু জানিনা।  কিন্তু এমনি এমনিও তো করতে পারে।  আর তাহলেই কমান্ডো একশান হবে।  আর প্রথম ছিটকে আসা গুলি আমার মাথাতেই লাগবে।  আমি আমার ভাগ্য সম্বন্ধে এইটুকু কনফিডেন্স তো রাখি।  আর কত আমেরিকা বিদ্বেষী দেশের ওপর দিয়ে প্লেনটা যাবে।  যদি কেউ নিচ থেকে গুলি করে।  ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গেলে নাহয় পাইলট ঠিকঠাক  প্লেন নামাতে পারে, কিন্তু যদি ঠিক মাঝ বরাবর বাজুকা ছুঁড়ে দেয় আর এত বড় প্লেন বিস্কুটের মতো দু টুকরো হয়ে যায়।  এই রে , আমি আবার ফোর্টি ফোর বি।  ইমার্জেন্সি লাইনে।  মানে ঠিক মাঝ বরাবর।  ঠিক আমার লাইন দিয়েই দু টুকরো হয়ে যাবে আর আমি টুক করে পরে যাবো।  ধুর ধুর এসব কি ভাবছি।  তার থেকে ফ্রি হুইস্কির কথা ভাবি।  সাথে সুন্দর সুন্দর খাবার।  আহা আলমন্ড দিয়ে ক্র্যানবেরি আপেল জুসের সাথে ভদকার তো জুড়ি মেলা ভার।  কিন্ত যদি খাবারে বিষ থাকে।  অন্তর্ঘাত তো হতেই পারে। অন্তর্ঘাত না হলেও ফুড পয়সন তো হতেই পারে।  হাজার হোক ফ্লাইট মুম্বাই থেকে ছাড়ছে আর মুম্বাইয়ে ইঁদুর মারা পাপ।  আমি বাবা কুড়কুড়ের যে প্যাকেট নিয়ে এসেছি তাই দিয়েই চালাবো।  এমনিতেও ফ্লাইটের বাথরুম খুব ছোট পায়খানা পেয়ে গেলে কি হবে।  তারওপর কাগজ শুরু জল নেই।  ওরে বাবা , সে আর এক চাপ।  সব না হয় মেনে নিলাম কিন্তু যদি ওঠার সময় বা নামার সময় রানওয়েতে গরু ঢুকে পরে , বা একটা গোটা ঈগল আত্মহত্যা করে তাহলে তো সবাইকে নিয়ে মরবে এক সাথে।  ধুর ধুর ধুর ধুর এই একরাশ বিচ্ছিন্ন চিন্তাভাবনার কোনো মানে হয় না।  যা হয় হবে।  দেখা যাক না কি হয়।  মরলে মরবো।  দুঃখ থাকবে একটাই, যে ফালতু মরবো। কিচ্ছু না করে , বসে বসে।  কিন্তু ফেমাস হয়ে যাবো।  অন্তত ছেলেপুলে বলতে পারবে যে ওই যে প্লেন এক্সিডেন্ট হয়েছিল না লন্ডন থেকে ডেট্রয়েট যাওয়ার মধ্যে , ওই প্লেনে বাবা ছিল। আর পৌঁছাতে পারলে তো সব ঠান্ডা। ওই শুরু হয়ে গেছে।  প্লেন হঠাৎ করে স্পিড নেওয়া আরম্ভ করেছে।  ফেল করা ছেলে হঠাৎ করে বাবাকে পেছনে দেখলে যে গতিতে দৌড়োয় ঠিক সেই ভাবে দৌড় শুরু করলো প্লেনটা। ঘটঘট করে আওয়াজ হচ্ছে।  রানওয়েটাও স্মুথ না।  ভীষণ কাঁপছে।  এবার মনে হয় উড়ে যাবে।  আমার পিঠ হেলে গেছে।  শরীর ভরশূন্য।  পায়ের তলায় সুড়সুড়ি।  পিঠে চাপ, চোখে সর্ষের ফুল , গলা মরুভুমি , রোস হাত খামচে ধরেচে।  যাঃ উড়েই  গেলাম শেষমেশ । ...          

Tuesday, June 13, 2017

আধ্যানের ডায়েরী (২৫) - আমার জন্মদিন


ভেবেছিলাম লিখবো না । বাবার ওপর হেব্বি রাগ হয়ে গিয়েছিল । অত করে বলা সত্বেও যখন সেই আমার জন্মদিনে এলোনা তখন আমিও লেখা ছেড়ে দিয়েছিলাম । কিন্তু যখন শুনলাম তিনি আসছেন ফাইনালি তখন মাফ টাফ করে দিয়েছি। হাজার হোক বাবা তো । কাহাতক রাগ করে থাকা যায় । তার ওপর একটা লাল টুকটুক ট্রাইসাইকেল পাঠিয়েছে । আর একটা অদ্ভুত খেলনা । তার গল্পই তো আজকে বলব। আমার জন্মদিনের গল্প ।

তখনও আমার জন্মদিন আসতে এক রাত বাকি । সকালে উঠলেই আমার হ্যাপ্পি বাড্ডে । রেগুলার মতই আমি অনেক রাতে খেয়ে খেলা করছি । হঠাৎ দেখি মা দৌড়ে বেড়াচ্ছে । কোনও কিছু ঘটার আগে মা একটাই কাজ করে , দৌড়ায় । আমি তখন বসে বসে টিভিতে শাকিরার গান  দেখছিলাম । কোথা থেকে মা এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল , “আরে চল চল,  কেক কাটতে হবে তো। বারোটা বাজতে চলল তো ।” আমি বেশ থতমত খেয়ে গেলাম। প্রথমে মা আমার বারোটা বাজাতে চলেছে । আর তারপরে কেক কাটবে । অনেক দিন ধরেই শুনছিলাম আমার জন্মদিনে কেক কাটা হবে । কিন্তু কেক যে কি বস্ত সেটা জানিনা। এটলিস্ট এটা একটা হাপি ইভেন্টে কাটা হয় সেটা জানি । কিন্তু এই এত রাতে কেন? জন্মদিন তো কালকে। আর মাই বা আমার বারোটা বাজাতে চলেছে কেন । তাহলে কি মা আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে । মা বাবাকে বলেছিল । এই এক বছর একা একা সামলেছি আর একদিন বেশী হলেই আমি ওকে দিয়ে আসব । কোথায় দিয়ে আসবে সেটা বলেনি । মা কে না কিরকম জুজুবুড়ির মত দেখতে লাগছিল । সত্যি আমাকে কোথাও দিয়ে আসবে না তো । কেক টা কি ?

  সন্দেহ আরও ঘনীভূত হল যখন একটা নতুন জামা পরিয়ে দিল  মা । আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলাম। তবু দেখি মায়ের কোনও উচ্চ বাচ্চা নেই । দিব্যি হাসি হাসি মুখে আমায় আদর করে চলেছে । এর পর দেখি দুটো ফোনে দুটো মুখ ফুটে উঠলো একটা মাসির , আর একটা বাবার । তাহলে কি সবাই আমায় বিদায় জানাবে । হাউ হার্টলেস । এরপর একটা বিশাল বড় বাক্স খুলে গেল । দেখলাম একটা বড় সাদা কিছুর ওপর অনেক কিছু লেখা । আর দুটো হলুদ আপ্পু দুদিক থেকে একটা বড় লাঠির ওপর ঝাপিয়ে পড়ছে । এ তো হাডুপের আপ্পু । আমার যেমন আপ্পু , ডাগ কাটিং কাকুর ছেলের আপ্পুর নাম হাডুপ । বুঝলাম ওটাই কেক আর ওর ওপরেই একটা বড় সর মোমবাতি লাগিয়ে মা বলল , “হ্যাপি বাড্ডে টু ইউ ...।। ”  অনেক বড় গান । ইয়া বড় । সাথে সবাই গাইল  , বাবা , দাদু , দিদা , মাসি সব্বাই । ব্যাপারটায় যেরকম ঘাবড়ে গিয়েছিলাম সেরকম ব্যাপারটা নয় । কিন্তু ঐ কেক জিনিসটা কি বিচ্ছিরি খেতে। কি মিষ্টি রে বাবা । আর আবার মা কেক তুলে তুলে মুখে মাখাচ্ছে । এ আবার কেমন ধারা ঢং । আমি কি ক্যানভাস না দেওয়াল । আর ঐ চ্যাটচ্যাটে জিনিসটা না মাখালেই নয় । তায় এত মিষ্টি । তোমরাই তো বল , “সুগার ইস ব্যাড” আর তুমিই তুলে তুলে গায়ে মাখাচ্ছ । আমার স্কিন খারাপ হয়ে গেলে কি হবে? ইউ গাইস ক্রিয়েট ইওর ওন প্রবলেম অ্যান্ড ইনভল্ভ এভরিওয়ান । আর বাবাই নাকি ঐটা ডিসাইন করে পাঠিয়েছে। বাবার মুখচোখ কিরকম রহস্যময় দেখলাম ।  

রাতে শুয়েছিলাম এই ভেবে যে বাবা সকাল বেলা আমায় ঘুম থেকে তুলে হ্যাপ্পি বাড্ডে বলবে । একজন বলেছিল বাবারা সুপারম্যান হয় । দেখবি ঠিক উড়ে উড়ে চলে আসবে। আমি ওসব ফালতু সুপেরস্টিশনে বিশ্বাস করিনা । আমি ভেবেছিলাম ব্যাপারটা সারপ্রাইস । বাবা সারপ্রাইস দিতে উস্তাদ। এই সমস্ত ন্যাকামো করে শেষমেষ ঠিক সময়ে হাজির হয়ে সারপ্রাইস দেবে । কিন্তু কই । সকালে নিজেই দিব্যি আড়মুড়ি কাটতে কাটতে উঠে পরে দেখি বাবা নেই । আর মা দৌড়ে বেড়াচ্ছে ।
       
জন্মদিন বলে কথা । এই ধরাধামকে ধন্য করে আমি বিছানা থেকে আস্তে আস্তে এক পা নামালাম। ভেবেছিলাম ওপর থেকে ফুলবৃষ্টি হবে । কিন্তু কই কিছুই হল না । আমি দিব্যি গ্যাট গ্যাঁট করতে করতে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে হাজির হলাম রান্নাঘরে । আমায় দেখেই মায়ের তড়াক লাফ । মা ভাবতেই পারেনি আমি উঠে গিয়ে মায়ের কাছে চলে আসব । চমক ভাংলে কোলে নিয়ে জন্মদিনের চটকানি ।
       

আজ নাকি আমার ড্রেস এসেছে নতুন , আমার খেলনা এসেছে নতুন , আজ নাকি অনেক কিছু খাবো । টোটাল মস্তি । আমরা জদিও অনেক কিছু প্ল্যান করেছিলাম । বাবা সব ভেস্তে দিল ।  বাবার আমার জন্য শেরওয়ানি আনার কথা ছিল । আমি আর বাবা ম্যাচিং ম্যাচিং ড্রেস পরে ফটো তুলব । কিন্ত সে কোথায় । যদিও ড্রেস আমি তখনও চোখে দেখিনি । মা বলল বিকালে মন্দিরে নিয়ে যাবে । কি মজা । সেখানে অনেক হালুম আপ্পু । সবাইকে বকে দেব । বেশ মজা লাগে।

       কিন্তু সে তো অনেক পরের ব্যাপার । তার আগে হঠাৎ করে মা পাত্তা দেওয়া বন্ধ করে দিল । ব্যাপারটা বুঝলাম না । রান্না ঘর থেকে কিছুতেই বেরচ্ছে না , আর দাদু আমাকেও কিছুতে রান্নাঘরে জেতে দিচ্ছে না। আজকে না আমার জন্মদিন । আজ কি আমায় বাধা দেওয়া উচিত । কিন্তু কিছু একটা হতে চলেছে যার কারনে এত কড়া কারফিউ।

       ব্যাপারটা বেশ বড় ব্যাপার । আমার জন্মদিনের লাঞ্চ প্রিপারেশান চলছিল । লাঞ্চের কথা পরে বলব । তার আগে বলি দুটো ইয়া বড় বড় বাক্সের কথা। কাল মা যখন অফিস থেকে ফিরল তখন একটা ইয়া বড় বাক্স ঠেলতে নিয়ে এলো। আমার ডাইপারের বাক্সের থেকেও বড় । আমি ঝাঁপিয়ে পরে খোলার চেষ্টা করলাম কিন্তু ব্যাপারটা বড়ই কঠিন । আমার “হেল্প মি” টাইপ কাঁচুমাচু মুখ দেখে মা খুলে দিতেই আমি আরও ফাঁপরে পরলাম। এসব কি । এক বাক্স ভাঙ্গাচোরা জিনিস। একটা চাকা বুঝতে পারলাম , বাকি সব গারবেজ। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে টিভির দিকে কন্সান্ট্রেট করতে চোখ সরাতে জেতেই হঠাৎ একটা কাগজ দেখলাম উঁকি মারছে । হিড় হিড় করে টেনে দেখি আমার একটা বন্ধু ওর মধ্যে একটা তিন চাকা ওয়ালা জিনিসের ওপর বসে আছে। কি সুন্দর জিনিসটা । আমার চেয়ার আর আমার প্রাম দুটোকে এক সাথে জুড়ে দিয়েছে। তায় আবার লাল টুকটুকে , মায়ের চটিটার মত।

       ওদিকে মায়ের সাথে বাবার কথা চলছে। মা বাবার কথা ফলো করলে অনেক কিছু এই পৃথিবী সম্বন্ধে শেখা যায়। সেদিন বুঝলাম ব্যাপারটা একটা গাড়ি । যার তিনটে চাকা আছে । সেটাই নাকি ভেঙ্গে ভুঙ্গে বাবা পাঠিয়ে দিয়েছে । জুড়ে নাও। আর মাও খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলো , “আমার ওসব করার সময় নেই।” হে হে , আমি জানি , কথাটা সেটা নয় । মায়ের ক্ষমতা নেই । এসব বাবার কাজ আর বাবা হাওয়া । আবার ঢং করে জিনিস পাঠিয়েছে। বেশ কিছুক্ষন ঝগড়া টগরা করে আমার ইন্টারেস্ট দিল বাড়িয়ে কিন্তু কাজের কাজ কিছু করল না।

হেব্বি রেগে গোঁ মেরে বসেছিলাম তখন দেখি মা ওই বাক্সের পেছন থেকে আরেকটা ছোট বাক্স বার করে দিল। সেটার মধ্যে আবার একটা বাক্স। তার ওপর ফুটো ফুটো । আমায় ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। কি করব আমি এটা নিয়ে । ভোঁদার মত বসে থাকলাম। এই লারন ইওরসেলফ টেকনিক খুব বাজে । আমি বলছি ফার্স্ট টাইম স্পুন ফিডিং ইস ইম্পরট্যান্ট । এই সব বিজ্ঞের ডোবাগুলো বুঝলে হয় । আমি বেশ কিছুক্ষন ওটা নিয়ে বসে থাকলাম তারপর মা এসে ওটার ঢাকনা খুলে ভেতর থেকে এক গাদা ছোট বড় গোল চৌকো কিসব বার করে আবার ঢাকনা বন্ধ করে চলে গেল । হাউ নন্‌সেন্স। ইট সাপোসড টু বি মাই খেলনা। কিন্তু বিকেম গারবেজ। চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে মা চলে গেল। আমি কি করি। আমি অনেক টানাটানি করার চেষ্টা করলাম ঢাকনাটা । কিন্তু নো নরন , নো চরণ । ইউরেকা, ওপরের ফুটো গুলো তো আছে । আমি একটা একটা করে জিনিস গলিয়ে দিতে লাগলাম। যতটা সোজা ভাবে বলছি ব্যাপারটা কিন্তু অতটা সোজা নয়। চৌকোটা ঠিক চৌকো ফুটো দিয়েই ঢুকবে , আর তারার মত যেটা সেটা কিন্তু গোল ফুটো দিয়ে ঢুকবে না। আমাকে অনেক প্লান করে কেরামতি করে তবে ব্যাপারটা আয়ত্তে আনতে হয়েছিল। কিন্তু মা তো অগা , ব্রেন কম । তাই কিছুক্ষন পর এসে ঢাকনাটা খুলে সব কিছু ধরাধর ঢেলে দিল। মায়ের এই সুক্ষ বুদ্ধির অভাব । আমার ব্রেন ফ্রেশ, ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড ইনোভেটিভ। বাবা মনে হয় মায়ের কাছে আমাকে জেতানোর জন্যই এটা পাঠিয়েছিলো।

ওদিকে তখন দাদু আমার ড্রেস বার করেছে। বাবা যেহেতু দেশি ড্রেস বগলে পুরে বসে আছে । তখন একেবারে খাঁটি এদেশি একটা ড্রেস নিয়ে মা চলে এসেছে । বেশ মজাদার ড্রেসটা । নামটাও বেশ , “থ্রি পিস সুট” । সুট নামটা শুনেই আমার হাসি পেয়ে গেল। এ আবার কি নাম। তায় আবার থ্রি পিস। এক দুই তিন। জামা , প্যান্ট আর কোট। এই এত জোব্বা আমার বিশেষ ভালো লাগে না । আমি বেশী হট তো , তাই শুধু ডাইপারেই খুশি । কিন্তু আজকের জন্মদিন ইস স্পেশাল। আজকে আর রোজকারের মত ড্রেসে থাকলে চলে না। কিন্তু ভয়ঙ্কর চুলকাচ্ছিল। আর ওদিকে মা তখন ক্যামেরা তাক করে বসে আছে। আমার হেব্বি বিরক্ত লাগছিল। একটাও ভালো পোস দিয়নি। কিন্তু ঐ যে মা যেই বাবাকে বলল আমি “থ্রি পিস সুট” পরেছি কোথা থেকে একটা হাসি খ্যাক খ্যাক করে বেড়িয়ে এলো। ব্যাস আমি ক্যামেরা বন্দী ।

এদিকে সারা গা চুলকাচ্ছে , ওদিকে দেখি মা খাবার সাজাচ্ছে। একের পর এক বাটি । বাটির পর আবার বাটি । তারপর আবার বাটি । একিরে বাবা । আমি তো সিম্পিল লিভিং হাই থিঙ্কিং। একটা বাটি একটা চামচ , আর চোখ টিভিতে। এরা যে কি করে না। টোটাল আনপ্রেডিকটেবল।  যখন ব্যাপারটা পুরো তিরী হয়ে টেবিলে সাজানো হল তখন তো আমি হাঁ । কেউ এত খেতে পারে ? এক দুই তিন চার পাঁচ পাঁচটা ভাজা, ডাল, তরকারী, চিংড়ি মাছ, রুই মাছ, পাঁঠার মাংশ, চাটনি, পায়েশ আর মিষ্টি । সব গন্ধ মিশে আমার গা ঘুলিয়ে উঠলো । এক সাথে টক, মিষ্টি, নোনতা সব গন্ধ মিলিয়ে আমার চোঁয়া ঢেকুর উঠে যাওয়ার জোগাড় । আমি বুঝতে পারলাম ওগুলো আমায় খাওয়ানোর চেষ্টা হবে এবার। দিলাম ককিয়ে কান্না। কি অত্যাচার আমিও খাবো না আর এরাও কিছুতেই ছাড়বে না । একদিকে দাদু একদিকে মা আর আমি অসহায় হয়ে কেঁদে কেটে হাত পা ছুঁড়ছি। আমি মিষ্টি খেতে একেবারেই পছন্দ করিনা আর সেই পায়েস আমার মুখে গুঁজবে। আমি শেষমেশ হেরে গেলাম । মুখে একটু পায়েস আমায় ঢোকাতেই হল ।

এত কেঁদেছিলাম যে গলা চোক হয়ে গেছিল। মনুষ্যত্বহীন দানবের দল । হোক সে মা , হোক সে দাদু , হোক আমার জন্মদিন। আমি বুঝে গেছিলাম যে তাদের কথামত কাজ না করলে তারা জোর করবে । এদিকে পেট জলে জাচ্ছে খিদেতে । আরও কাঁদতে ইচ্ছা করেও কাঁদতে পারলাম না । নো ওয়াটার লেফট ইন মাই স্টোরেজ । ঠিক তখনি আমার সাধের এক বাটি খিচুড়ি নিয়ে মা হাসি মুখে এলো আমায় খাওয়াতে। এর রঙ, স্বাদ, গন্ধ সব আলাদা। মনে হয় সব কিছু মিশিয়ে আমার জন্য খিচুড়ি বানিয়ে নিয়ে এসেছে। বুদ্ধি বটে মায়ের। চকাম চকাম করে সব খেয়ে নিলাম । কি শান্তি তখন।


যাইহোক সব মিলিয়ে আমার জন্মদিন অন্যদিনের থেকে অদ্ভুত গেল। আজকের ডায়েরীতে ব্যাস এইটুকুই। কারন আমার এক বছরের সিসন ওয়ান এখানেই সমাপ্ত। আবার বাবা এলে আমি আর বাবা মিলে সিসন টু লিখব। ততদিনের জন্য টা টা বাই বাই ।     


আধ্যানের ডায়েরির আগের পাতাগুলো