Friday, January 19, 2018

প্রবন্ধ ২৪ - অনেক বই একসাথে পড়া



বেশ কয়েক বছর আগে আমার মনে একটা প্রশ্ন এসেছিলো, এক সাথে অনেক বই কি ভাবে পড়া যায়।  প্রশ্নটা হঠাৎ আসেনি।  এসেছিলো, তার কারণ তখন সদ্য সদ্য কাগজের বই থেকে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বই পড়ার চেষ্টা শুরু করেছি। আগে বই কিনতাম , বা ধার করতাম বা লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে আসতাম।  লাইব্রেরি থেকে বই আনার একটাই সমস্যা ছিল বই ফেরত দেওয়ার সময়সীমা।  পাঠ্য বই বা ভোকেশনাল স্টাডি বুক পড়া এক জিনিস, আর কাজের বাইরে হবি হিসেবে কিছু  বই পড়া আরেক। একটা বাধ্যতা , আরেকটা আনন্দ। আমাদের জীবনে কাজের জন্য পড়াতেই বেশির ভাগ সময় চলে যায়।  এছাড়া দৈনন্দিন কাজের চাপে নিজের পছন্দের বই পড়ার সময় বার করা বেশ সমস্যা। তার ওপর আছে ছন্দপতন।  জীবনের যে সময় চাকরির জন্য দৌড়েই চলে যায় সে সময় বড় উপন্যাস ধরলে সে কয়েকদিনের মধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলে পড়া বন্ধ হয়ে যায়।  আমার ঠিক সেইরকমই চলছিল। হঠাৎ করে পেয়ে যাওয়া এক লাইব্রেরি সমান ইবুক পেয়ে গিয়ে আমি তখন খুশিতে আত্মহারা।  অথচ বছরখানেক পরে দেখি আমি কিছুই পরে উঠতে পারিনি।  যেহেতু ফ্রি ডাউনলোড তাই প্রচুর ডাউনলোড করে প্রচুর খাবলেছি।  অথচ শেষ কিছুই করিনি।  বই পড়া আমার ছোটবেলার নেশা।  কিন্তু অফিসের প্রচন্ড চাপের মাঝে বেশির ভাগ সময় পড়া হয়ে ওঠেনা।  তাই আমার জীবন বৃথা বলে ভবিতব্যকেও গালাগাল করেছি।  কিন্তু যখন বুঝলাম এসব গালাগাল করে লাভ নেই , এর একটা সমাধান বার করতে হবে, তখন খুঁজতে লাগলাম কি ভাবে একাধিক বই পড়া যায় এবং শেষ করা যায়।  কিছু মনস্তাত্বিক আর্টিকেল পড়ে নিজের ওপর এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম।  

 দীর্ঘ তিন বছরের চেষ্টার পর এখন আমি এক সাথে অন্তত সাতটা বই পড়ি।  না না একদিনে নয় , বা এক সময়ে নয়। আমি এক সাথে সাতটা বই শুরু করি ও শেষ করি।  সকলের ক্ষেত্রে এই ধরণের পাঠপদ্ধতি হয়তো সম্ভব হবে না কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে তার কিছু কারণ আছে।  প্রথম কথা আমার পাঠ বৈচিত্র বিস্তার প্রচুর। আমি একাধারে গল্প উপন্যাসের সাথে প্রচুর নন-ফিকশন পড়ি।  আমি বাংলা ইংলিশ দুই ভাষাতেই পড়ি।  অনুবাদ সাহিত্যে নাক কুঁচকোই না। মোপাসাঁর ফ্রেঞ্চ স্টোরি আমি ইংলিশের বদলে বাংলায় অনুবাদ পছন্দ করি।  শুধুমাত্র ইংলিশ রাইটার এর লেখা ইংলিশ বই ইংলিশে পড়ি।  বাকি সবটাই বাংলায়।  আমি বছরে কটা বই পড়বো সেটা বছরের  শুরুতে নিজেকে চ্যালেঞ্জ করি।  আর সারা বছর আমার প্রোগ্রেস ট্র্যাক করি।  

এই একসাথে অনেক বই পড়ার জন্য প্রথম কাজ হলো বই সিলেকশন, যেটা সবথেকে ইম্পরট্যান্ট।  আর এটা নিতান্ত ব্যক্তিগত।  আমারটা আমি এখানে বলছি।  আমি  যে যে বই এই মুহূর্তে পড়ছি সেটা দিয়ে শুরু করি।  




১) অসুরা - আনন্দ নীলাকান্তন রাবনের ওপর বই।  রাবনের মুখ দিয়ে বলা তার নিজস্ব আত্মকাহিনী।  সত্য ও শিল্প নিয়ে এক অদ্ভুত জীবনী।  
২) আইসিস - মাইকেল উইস ও হাসান হাসান 
কুখ্যাত আইসিস এর ওপর লেখা এক এনালাইসিস 
৩) এন এরা অফ ডার্কনেস - শশী থারুর 
ইংরেজরা কি ভাবে দেশকে লুট করেছিল তা নিয়ে এক চূড়ান্ত তথ্যমূলক ইতিহাস ভিত্তিক বই।  
৪) শীর্ষেন্দু সেরা ১০১ গল্প 
শীর্ষেন্দুর বাছাই করা ১০১টি গল্প 
৫) ঘুনপোকা - (উপন্যাস সমগ্র ) শীর্ষেন্দু 
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বাছাই করা উপন্যাসের বই এর প্রথম উপন্যাস। 
৬) দা মুঘল সিরিজ - ব্রাদার্স এট ওয়ার - আলেক্স রাদারফোর্ড (  অনুবাদ সাদেকুল আহসান কল্লোল) 
মুঘল সাম্রাজ্যের ওপর লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস 
৭) স্বামী বিবেকানন্দর সম্পূর্ণ বাণী ও রচনা।  

তাহলে বুঝতে পারছেন , আমার বই এর লিস্টে আছে নন ফিকশন , ইতিহাস , গল্প সমগ্র , সামাজিক উপন্যাস , ঐতিহাসিক উপন্যাস ও ধর্মীয় গ্রন্থ।  যেগুলো হয়তো এক আলমারিতে রাখাও যাবে না।  ব্রিটিশদের গালাগালি দেওয়া বই এর পরেই ব্রিটিশের লেখা ভারতীয় ইতিহাসের ঐতিহাসিক উপন্যাস তুলে নেওয়া , বা রাবনের জয়গান গাওয়ার সাথে সাথে ধর্মের সাত্বিক ধারা পড়া , সব কিরকম আজগুবি।  কিন্তু ভালো করে দেখলে একটা ছন্দ পাওয়া যাবে।  

আমরা যখন বই পড়ি তখন আমরা লেখকের চিন্তাভাবনার কবলে চলে আসি।  তাই পরস্পর বিরোধী লেখা পড়লে একটু কষ্ট হয় বটে কিন্ত যুক্তিবাদ বেঁচে থাকে ও চিন্তায় স্বতন্ত্র আসে।  

আমাদের আসে পাশে যা ঘটছে তা যখন বইয়ের পাতায় চলে আসে তখন তা পড়তে বা মনে রাখতে সুবিধে হয়।  আইসিস নিয়ে প্রত্যেক দিন ঘটনা যখন খবরের কাগজে চলতে থাকে তখন এর আভ্যন্তরীণ ঘটনাবলী পড়লে বুঝা যায় কি হচ্ছে।  আর পড়তেও সহজ হয়।  কিন্তু অবশ্যই ঘুম থেকে উঠে এই বই পড়া যায় না।  কি যায় , সেটা হল ইতিহাসভিত্তিক বা ধর্মীয়।  কোথাও ঘুরতে যাচ্ছেন অপেক্ষা করছেন নেক্সট ট্রান্সপোর্টের জন্যে।  একটা ছোট গল্প টুক করে পরে নিতে পারেন।  

আমি প্রতি বছর একজন লেখককে ধরে পড়া শুরু করি।  একই লেখক ভিন্ন গল্প ভিন্ন ধারায় লিখতে পারেন।  কিন্তু ভাষা পরিবর্তন কম হয়।  তাই যদি একই লেখকের বই এক নাগাড়ে পড়তে থাকেন তাহলে গতি বৃদ্ধি হয়।  কারণ আপনি পরের শব্দ পড়ার থেকে উপলব্ধি করতে পারেন অনেক তাড়াতাড়ি।  শীর্ষেন্দুর অনেক টুক টাক লেখা পড়েছি বটে।  কিন্তু এই বছর ডেডিকেট করেছি তার জন্য।  অন্য লেখক পড়লেও বেশিরভাগ শীর্ষেন্দুরই পড়বো।  দুটো উপন্যাস যদি একই ধারার হয় তাহলে এক সাথে পড়া আমার পক্ষে সম্ভব হয় না।  তাই একটা সামাজিক উপন্যাস ও একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস এক সাথে শুরু করেছি।  

আলেক্স রাদারফোর্ডের সাত খন্ডে বিশাল এই ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথমটা পড়ার পর যেহেতু ভাষা সড়গড় হয়ে গেছে আর লেখক কোন জিনিসে ফোকাস করবে সেটা বোঝা হয়ে গেছে তাতে গড় গড় করে পরের উপন্যাস এগিয়ে  চলেছে।  যদিও তিনি ইংলিশ এ লিখেচেন।  কিন্তু আমি এই বইটা অনুবাদ পড়তে বেশি পছন্দ করলাম কারণ ইংলিশটা বেশ কিছু জায়গায় অতি জটিল করে ফেলেছে । আর নিজের ভাষায় পড়লে মনেও থাকে বেশি।  

শশী থারুরের লেখা পড়তে গেলে মাঝে মাঝেই ডিকশনারি লাগে বটে, কিন্তু ওই বইটা আমি তখন পড়ি যখন আমার মাথা ঠান্ডা আর হাতে সময় থাকে।  এক সাথে অন্তত কুড়ি পাতা না পরে উঠিনা।  

যেমন একই সময় খাবার দিলে কুকুরের ঠিক একই সময় নাল ঝরতে আরম্ভ করে।  আমাদের ব্রেনও তাই।  একই সময়ে একই ধরণের খাবার দিলে ব্রেন ঠিক একই সময়ে একই জিনিস চায় ও মনেও রাখে।  হঠাৎ করে রুটিন পরিবর্তন না করলে আর ডিসিপ্লিন মেন্টেন করলে এই ভাবে বই পড়া সম্ভব হয়।  

এবার আরেকটা আঙ্গিক বলি।  গুডরিডস বলে একটা ওয়েবসাইট / এপপ আছে যেটা বই পড়ুয়াদের ফেসবুক। ওখানে বছরের প্রথমে নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়, যে কটা বই পরবেন সারা বছরে।  আমি যেমন পঁচিশ টার্গেট রাখি।  মাসে দুটো বই।  বেশির ভাগ সময় হয়ে ওঠে না।  কিন্তু লক্ষ্য একটা স্থির করলে  ক্ষতি কি।  আর পড়ুয়াদের একটা গ্রূপ সবসময় লাগে।  নাহলে এই অসাধারণ অভ্যাস দুদিনে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।  এই ওয়েবসাইটে অনেক লোক আছে যারা রেগুলার পড়েন ও ছোট ছোট রিভিউ লেখেন।  ভালো লাগবে একাত্ব হতে। নিজে দু লাইন রিভিউ লিখলে আরো বেশি একাত্ব হওয়া যায়।  

মোটামুটি এই ভাবেই এখন কাজের বইয়ের বাইরে প্রচুর বই পড়া সম্ভব করে ফেলেছি দীর্ঘদিনের প্র্যাক্টিসে।  ডিসিপ্লিন ইস দা কি।  পড়ার বই যেমন নিয়ম করে পড়া উচিত , পড়ার বাইরে পড়াতেও একটা নিয়ম আনলে মন আর বুদ্ধি দুটোই খুশি থাকে।  তাহলে আর কি নিজের নিয়ম নিজে বানান আর শুরু করে দিন।    
   


প্রবন্ধ